পশ্চিম দিকে পা ছড়িয়ে বসলে কি গুনাহ হয়? এই বিষয়ে ইসলাম কী বলে?

প্রকাশঃ নভেম্বর ১, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৩৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৩৭ অপরাহ্ণ

মুসলিম পরিবারে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ পশ্চিম দিকে পা ছড়িয়ে বসলে বা ঘুমালে বড়রা তাকে সতর্ক করেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ থেকে পবিত্র কাবা শরিফ পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এ কারণে মুসলমানদের কাছে পশ্চিম দিকের প্রতি বিশেষ সম্মান ও শ্রদ্ধা রয়েছে।

তবে এ নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে, পশ্চিম দিকে পা ছড়িয়ে বসা বা ঘুমানো কি ইসলামে নিষিদ্ধ? এমন কাজ করলে কি গুনাহ হয়, নাকি এটি কেবল ধর্মীয় শিষ্টাচারের বিষয়? এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা কী, তা জানা প্রয়োজন।

কেবলার প্রতি সম্মান দেখানো

ইসলামে পবিত্র কাবা শরিফের মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন। তাই কেবলার প্রতি সম্মান দেখানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আদবের অংশ।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়া থেকেই উৎসারিত।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩২)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন একজন মুমিনের অন্তরের তাকওয়ার পরিচয় বহন করে। এ কারণে ইসলামি আলেমরা পবিত্র কাবা শরিফ ও কেবলার মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তবে কেবলার দিকে পা রাখার বিষয়টি বুঝতে হলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিধানগুলোও জানা জরুরি।

পশ্চিম দিকে পা দেওয়া কি হারাম?

পবিত্র কাবা শরিফ বা কেবলার দিকে পা ছড়িয়ে বসা কিংবা ঘুমানোকে সরাসরি হারাম ঘোষণা করে কোরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। তবে পবিত্র কাবার সম্মান রক্ষায় ইসলাম কিছু শিষ্টাচারের নির্দেশ দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মলমূত্র ত্যাগের সময় কেবলার দিকে মুখ বা পিঠ করে বসতে নিষেধ করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘তোমরা যখন মলমূত্র ত্যাগ করতে যাও, তখন কেবলার দিকে মুখ বা পিঠ করে বসবে না…।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৪)

এই নির্দেশনার আলোকে ইসলামি আইনবিদরা কেবলার প্রতি সম্মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। হানাফি ফিকহের আলোচনায় বিনা প্রয়োজনে কেবলার দিকে পা ছড়িয়ে বসাকে মাকরুহ বা অপছন্দনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইমাম ইবনে আবিদিনের রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার গ্রন্থেও পবিত্র কোরআন, কাবা শরিফ ও কেবলার দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে পা ছড়িয়ে দেওয়াকে আদবের পরিপন্থী হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৫৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

অর্থাৎ, বিষয়টি সরাসরি হারাম বা বড় গুনাহের পর্যায়ে পড়ে না। তবে যথাযথ সম্মান বজায় রাখতে বিনা প্রয়োজনে এমন কাজ থেকে বিরত থাকা ভালো।

অসুস্থতা বা প্রয়োজনে কি ছাড় রয়েছে?

ইসলাম মানুষের সামর্থ্য ও পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেয়। কেউ অসুস্থ হলে কিংবা শারীরিক সমস্যার কারণে পশ্চিম দিকে পা না রেখে বসা বা ঘুমানো সম্ভব না হলে তাঁর জন্য কোনো গুনাহ নেই।

এমনকি অসুস্থ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বা বসে নামাজ আদায় করতে না পারলে শুয়ে ইশারার মাধ্যমে নামাজ পড়তে পারেন। এ অবস্থায় তাঁর পা কেবলার দিকে থাকলেও সমস্যা নেই।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কারও ওপর তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার চাপিয়ে দেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)

একইভাবে ঘরে জায়গার অভাব, শারীরিক অসুবিধা কিংবা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে পশ্চিম দিকে পা দিয়ে বসতে বা ঘুমাতে হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।

ঘুমের মধ্যে পা পশ্চিম দিকে চলে গেলে কী হবে?

অনেক সময় মানুষ ঘুমানোর সময় নিজের অজান্তেই শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করেন। ফলে ঘুমের মধ্যে পা পশ্চিম দিকে চলে যেতে পারে। এ ধরনের অনিচ্ছাকৃত কাজের জন্য ইসলামে কাউকে গুনাহগার করা হয় না।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ভুলবশত যা করো, তাতে তোমাদের কোনো অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা সংকল্প করে (তা অপরাধ)।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫)

তাই কেউ ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন তাঁর পা পশ্চিম দিকে রয়েছে, তাহলে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা বা নিজেকে পাপী মনে করার প্রয়োজন নেই। কারণ, অনিচ্ছাকৃত কাজের জন্য মানুষকে দায়ী করা হয় না।

ধর্মীয় শিষ্টাচার মানতে হবে, বাড়াবাড়ি নয়

পবিত্র কাবা শরিফ ও কেবলার প্রতি সম্মান দেখানো প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। তবে এ বিষয়কে কেন্দ্র করে কাউকে অযথা ভয় দেখানো বা ছোটখাটো বিষয়কে বড় গুনাহ হিসেবে প্রচার করাও ঠিক নয়।

ইসলামে মাকরুহ ও হারামের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মাকরুহ অর্থ অপছন্দনীয়, আর হারাম অর্থ নিষিদ্ধ। তাই কোনো কাজকে মাকরুহ বলা হলে সেটিকে সরাসরি হারাম বা বড় পাপ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

ইমাম শাতিবি তাঁর আল-মাওয়াফাকাত ফি উসুলিশ শারিয়াহ গ্রন্থে ধর্মীয় বিধান প্রয়োগে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। (খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩১২, দার ইবনি আফফান, সৌদি আরব, ১৯৯৭)

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিনা প্রয়োজনে ইচ্ছাকৃতভাবে কেবলার দিকে পা ছড়িয়ে বসা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। এটি ধর্মীয় শিষ্টাচারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়। তবে অসুস্থতা, জায়গার অভাব কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে এমনটি হলে গুনাহ হবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে অযথা ভয় না ছড়িয়ে ইসলামের প্রকৃত নির্দেশনা জানা ও মেনে চলাই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

November 2026
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
20G