দলিল ছাড়াই রেজিস্ট্রেশনের অভিযোগ ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে

প্রকাশঃ অক্টোবর ২৯, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৫৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৫৫ অপরাহ্ণ

ঢাকার ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি নিবন্ধন, পুরোনো পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ভিত্তিতে দলিল সম্পাদন এবং সরকারি রাজস্ব আদায় নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে জমির দলিল নিবন্ধন এবং সরকারি কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ও দলিল লেখক। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই কর্মকর্তা।

অভিযোগ অনুযায়ী, নরাইবাগ মৌজার এমন একটি জমি নিবন্ধন করা হয়েছে, যার আগের কোনো বৈধ দলিল ছিল না বলে দাবি করা হচ্ছে। গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জমিটির নিবন্ধন হয়। দলিল নম্বর ৭৫৩১/২৬। এ নিবন্ধনের জন্য পাঁচ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, জমিটি প্রথমে জাল দলিলের মাধ্যমে নিবন্ধনের চেষ্টা করা হলে সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম তা শনাক্ত করেন। সে সময় দলিল লেখক এবং জমির দাতা ও গ্রহীতাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে দলিল লেখক পরিবর্তন করে একই জমি কমিশনের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে নিবন্ধন করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জমিটির সঙ্গে আব্দুল জব্বার নামের এক ব্যক্তির পরিবারের সম্পত্তির সম্পর্ক রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ওই এলাকার চেয়ারম্যান ছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, তৎকালীন প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলে নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে রেকর্ডে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে জমির প্রকৃত মালিকানা ও নিবন্ধনের বৈধতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড এবং দলিল যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুই ভাই, ছয় বোন ও তাঁদের মায়ের অংশের জমি থেকে মা, পাঁচ বোন এবং এক ভাই রেজাউল করিমের নামে জমি লিখে দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। অন্য ভাই মো. নিয়াজ উদ্দীন এ লেনদেন সম্পর্কে জানতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুরোনো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে প্রশ্ন

ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে পুরোনো পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ভিত্তিতে জমি নিবন্ধনের আরেকটি অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে মো. নুরুল আলম আব্দুল্লাহ মোল্লাকে ১৩ শতাংশ জমির জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আব্দুল্লাহ মোল্লা জমিটি নিজের ছেলে ওমর ফারুকের নামে নিবন্ধন করে দেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় তিন লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

তবে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কার্যকর ছিল কি না, মূল দলিলের অবস্থা কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুর কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা যাচাই করা জরুরি। আইনগতভাবে সব পাওয়ার অব অ্যাটর্নি একই নিয়মে পরিচালিত হয় না। তাই সংশ্লিষ্ট দলিলের ধরন ও প্রযোজ্য আইন পরীক্ষা না করে নিবন্ধনটি অবৈধ বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

আবাসন কোম্পানির জমি নিবন্ধনে কর ফাঁকির অভিযোগ

সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অভিযোগ অনুযায়ী, আবাসন কোম্পানির কাছ থেকে জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর ও ফি এড়াতে কোম্পানির নাম বাদ দিয়ে সাধারণ ব্যক্তির নামে দলিল নিবন্ধনের পরামর্শ দেওয়া হতো। এ ক্ষেত্রে সরকারকে দেওয়ার সম্ভাব্য অর্থের একটি অংশ ঘুষ হিসেবে নেওয়া হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।

এমন একটি নিবন্ধন গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দলিল নম্বর ৮৩৭৫/২৬। জমির পরিমাণ সাড়ে চার শতাংশ। দলিলে গ্রহীতা হিসেবে নজরুল ইসলাম এবং দাতা হিসেবে আলমগীরের নাম রয়েছে বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন ফ্ল্যাটকে পুরোনো দেখিয়ে এবং নাল জমিতে বাড়ি থাকাকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। জমির নামের সামান্য ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যক্তি।

দলিল লেখকদের বক্তব্য

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দলিল লেখক অভিযোগ করেন, ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। তাঁদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

অভিযোগ অস্বীকার সাব-রেজিস্ট্রারের

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম এসব তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁর বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে। তবে কাজের ক্ষেত্রে কোনো ভুল হয়ে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলিল, ভূমি রেকর্ড, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, নিবন্ধন ফি ও কর পরিশোধের নথি যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

20G