এক পাশে সমুদ্রের নীল জলরাশি, অন্য পাশে পাহাড়, মেরিন ড্রাইভে প্রতিটি বাঁকেই মুগ্ধতা
ভ্রমণে বের হলে সাধারণত সবার লক্ষ্য থাকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো। কিন্তু এমন কিছু পথ রয়েছে, যেগুলোতে চলতে চলতেই ভ্রমণের আসল আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ তেমনই একটি পথ। একদিকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, অন্যদিকে সবুজ পাহাড়ের সারি। মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চলা সড়কটি যেন প্রকৃতির অপূর্ব এক ক্যানভাস। গাড়িতে বসে জানালার বাইরে তাকালেই চোখে পড়ে ঢেউয়ের ওঠানামা, পাহাড়ের নীরবতা আর উপকূলীয় জনপদের ব্যস্ত জীবন।
কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণপথ। কোথাও সমুদ্রের ঢেউ এসে ভিজিয়ে দেয় সৈকতের বালু, কোথাও পাহাড়ের সবুজ ঢাল দৃষ্টি আটকে রাখে। আবার উপকূলের বিভিন্ন অংশে দেখা যায় মাছ ধরার নৌকা নিয়ে ব্যস্ত জেলেদের। প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্য মেরিন ড্রাইভের প্রতিটি অংশকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য।
সাগর-পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতেই কেটে যায় পথ
মেরিন ড্রাইভে ভ্রমণ মানে শুধু সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা নয়। এই সড়কের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য যাত্রাপথে একাধিক জায়গায় থামার সুযোগ রয়েছে। হিমছড়ির পাহাড়ি পরিবেশ, ইনানী সৈকতের পাথর আর নীল সমুদ্রের বিস্তৃতি ভ্রমণে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
খোলা জিপে চড়ে সমুদ্রের বাতাস উপভোগ করা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির জানালা দিয়ে দূরের পাহাড় দেখা, দুইভাবেই মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য অনুভব করা যায়। কোথাও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখা, কোথাও ছবি তোলা, আবার কখনো নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটানো, সব মিলিয়ে এই যাত্রা হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
তবে শুধু দ্রুত পথ পেরিয়ে যাওয়ার বদলে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বের হওয়াই ভালো। কারণ মেরিন ড্রাইভের আকর্ষণ কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো সড়কজুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার উপায়
মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণ করতে হলে প্রথমে পৌঁছাতে হবে কক্সবাজার শহরে। ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন কিংবা বিমানে সেখানে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাসে যাতায়াত: ঢাকা থেকে সৌদিয়া, গ্রিন লাইন ও শ্যামলী পরিবহনের মতো বাসে কক্সবাজার যাওয়া যায়। বাসের ধরন, আসনের মান ও পরিবহনভেদে ভাড়া কমবেশি হয়। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা হতে পারে।
ট্রেনে যাতায়াত: ঢাকা থেকে কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলস্টেশন হয়ে কক্সবাজার এক্সপ্রেসে যাওয়া যায়। উল্লেখিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, শোভন চেয়ারের ভাড়া ৭৫৪ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণিতে ১ হাজার ৪৪৩ টাকা এবং এসি বার্থে ২ হাজার ৬৪৪ টাকা।
বিমানে যাতায়াত: ঢাকা থেকে কক্সবাজারে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনাকারী বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও এয়ার অ্যাস্ট্রার নাম উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, টিকিটের দাম প্রায় ৩ হাজার ৪০০ টাকা থেকে শুরু হতে পারে। তবে তারিখ, আসন ও বুকিংয়ের সময় অনুযায়ী ভাড়া পরিবর্তিত হয়।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার: চট্টগ্রাম থেকেও সড়ক ও রেলপথে কক্সবাজারে যাওয়া সম্ভব। বাসে যেতে নতুন ব্রিজ, অলংকার মোড় বা দামপাড়া এলাকার বাস কাউন্টার থেকে টিকিট নেওয়া যায়। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাসভাড়া প্রায় ৪২০ থেকে ১ হাজার টাকা। ট্রেনে শোভন চেয়ারের ভাড়া ২৫০ টাকা এবং স্নিগ্ধা শ্রেণিতে ৪৭০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের বর্তমান সময়সূচি ও ভাড়া যাচাই করে নেওয়া উচিত।
কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ ঘুরবেন যেভাবে
কক্সবাজার শহরের কলাতলীর ডলফিন মোড় এলাকা থেকে মেরিন ড্রাইভ ঘোরার জন্য খোলা জিপ, সিএনজি বা অটোরিকশা ভাড়া করা যায়। দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করলে খোলা জিপ একটি বিকল্প হতে পারে। অন্যদিকে, ছোট দল বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে চাইলে সুবিধা অনুযায়ী অন্য যানবাহন বেছে নেওয়া যায়।
পুরো পথ ঘুরে বিভিন্ন জায়গায় বিরতি দিতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় হাতে রাখা যেতে পারে। তবে কোথায় কোথায় যাবেন, কতক্ষণ অবস্থান করবেন এবং যানবাহনের ধরন কেমন, তার ওপর মোট সময় নির্ভর করবে।
গাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে আনুমানিক ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নির্দিষ্ট বা হালনাগাদ ভাড়ার নিশ্চয়তা নয়। যাত্রার সময়, দূরত্ব, গাড়ির ধরন ও দর-কষাকষির ভিত্তিতে খরচ বদলাতে পারে।
গাড়ি ভাড়া করার আগে চালকের সঙ্গে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করে নিন। যেমন, কোন কোন জায়গায় যাওয়া হবে, কতক্ষণ অপেক্ষা করা যাবে, অতিরিক্ত সময়ের জন্য আলাদা টাকা লাগবে কি না এবং নির্ধারিত ভাড়ার মধ্যে অন্য কোনো খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কি না। এতে ভ্রমণের মাঝপথে অপ্রত্যাশিত খরচের ঝামেলা কমবে।
কোথায় থাকবেন, কোথায় খাবেন
মেরিন ড্রাইভ ঘুরে দেখার জন্য কক্সবাজার শহরে অবস্থান করাই অনেকের কাছে সুবিধাজনক। শহরে বিলাসবহুল রিসোর্ট থেকে শুরু করে মাঝারি বাজেটের হোটেল পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।
থাকার জায়গা হিসেবে সায়মন বিচ রিসোর্ট, মারমেইড বিচ রিসোর্ট, সি প্যালেস, সি গাল ও লং বিচের মতো পরিচিত প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নিতে পারেন। তবে বুকিং দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থান, কক্ষের ভাড়া, সুযোগ-সুবিধা এবং সাম্প্রতিক অতিথিদের অভিজ্ঞতা যাচাই করা ভালো।
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যটকের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। এ সময়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে আগেভাগে হোটেল বুকিং দিলে পছন্দের কক্ষ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
খাবারের জন্য কক্সবাজার শহরে স্থানীয় খাবার, বাঙালি খাবার ও সামুদ্রিক খাবারের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ রয়েছে। রোদেলা, পৌষি, ঝাউবন ও ধানসিঁড়ির মতো পরিচিত খাবারের জায়গাগুলোর খোঁজ নিতে পারেন। সামুদ্রিক মাছ বা অন্য কোনো বিশেষ খাবার অর্ডার করার আগে দাম, পরিবেশনের পরিমাণ এবং অতিরিক্ত চার্জ সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত।
ভ্রমণের আগে যেসব বিষয় মাথায় রাখবেন
মেরিন ড্রাইভে যাওয়ার আগে আবহাওয়া ও সড়কের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। পথে নিরাপত্তার জন্য তল্লাশিচৌকি থাকতে পারে। তাই জাতীয় পরিচয়পত্র বা প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
যানবাহন ভাড়া ও হোটেলের খরচ আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া ভালো। পাশাপাশি যাত্রাপথে কোথায় বিরতি দেবেন, কতক্ষণ থাকবেন এবং ফেরার পরিকল্পনা কী হবে, তা আগেই নির্ধারণ করে রাখুন। সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থান করার সময় স্থানীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলুন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় নামা থেকে বিরত থাকুন।
আরেকটি বিষয় হলো, ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখা। তাড়াহুড়া করে সব জায়গা ঘুরে দেখার চেষ্টা করলে পথের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ কমে যায়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বিরতি দিয়ে ধীরে ধীরে এগোনোর পরিকল্পনা করতে পারেন।
মেরিন ড্রাইভ, যেখানে যাত্রাপথই ভ্রমণের স্মৃতি
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের বিশেষত্ব শুধু এর দীর্ঘ সড়ক কিংবা সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থান নয়। পাহাড়, সমুদ্র, উপকূলের জনজীবন এবং প্রকৃতির বদলে যাওয়া দৃশ্য একসঙ্গে দেখার সুযোগই এই পথকে আলাদা করে তুলেছে।
কখনো সমুদ্রের ঢেউ, কখনো পাহাড়ের সবুজ, আবার কখনো জেলেদের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়বে। পথের প্রতিটি বাঁকে বদলে যেতে পারে চারপাশের দৃশ্য। তাই মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা না ভেবে যাত্রাপথ উপভোগ করার জন্যও সময় রাখুন।
অনেক সময় ভ্রমণের সবচেয়ে মনে রাখার মতো মুহূর্ত তৈরি হয় কোনো বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্রে নয়, বরং সেখানে যাওয়ার পথে। মেরিন ড্রাইভ সেই অনুভূতি পাওয়ার জন্যই হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের ঠিকানা।
প্রতি / এডি / শাআ



















