মঙ্গলের বায়ু থেকে জ্বালানি তৈরির নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন চীনা বিজ্ঞানীদের
মঙ্গলে ভবিষ্যতে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নভোচারীদের জন্য সেখানেই জ্বালানি উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে তরল জ্বালানি তৈরির একটি নতুন অনুঘটক উদ্ভাবন করেছেন চীনা গবেষকেরা। তাঁদের এই গবেষণা ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানকে আরও স্বনির্ভর করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
চীনের হেফেই শহরে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন ল্যাবরেটরির গবেষক দলটি বিশেষ এই অনুঘটক তৈরি করেছে। এর সাহায্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও হাইড্রোজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে মিথানল নামের তরল জ্বালানি উৎপাদন করা যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের ৯৫ শতাংশেরও বেশি গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইড।
মহাকাশসম্পদ নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানী ঝাং ঝে ও তাঁর সহকর্মীরা এ বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। জার্নাল অব ডিপ স্পেস এক্সপ্লোরেশন সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় তাঁরা দেখিয়েছেন, নতুন অনুঘটকটি ব্যবহার করে মঙ্গলের স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে জ্বালানি তৈরির পথ তৈরি হতে পারে।
মিথানল কেন গুরুত্বপূর্ণ
মিথানল কেবল একটি তরল জ্বালানি নয়, বিভিন্ন ধরনের শক্তি উৎপাদন ও শিল্পকার্যেও এটি ব্যবহার করা যায়। গবেষকদের মতে, মিথানল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তাপ সরবরাহ সম্ভব। মঙ্গলে চলাচলকারী রোভার পরিচালনার ক্ষেত্রেও এটি কাজে লাগতে পারে। এ ছাড়া অ্যান্টিফ্রিজ, নির্মাণসামগ্রী ও বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও মিথানল ব্যবহার করা যায়।
গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষ পাঠানো এবং সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বসবাসের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। পৃথিবী থেকে জ্বালানি, পানি ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান বহন করে নেওয়া ব্যয়বহুল। মঙ্গলের পরিবেশ থেকেই এসব উপকরণ উৎপাদন করা গেলে মহাকাশযানে বহন করতে হবে কম সরঞ্জাম। এতে অভিযানের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলার সম্ভাবনাও বাড়বে।
কীভাবে তৈরি হবে জ্বালানি
চীনা বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত অনুঘটকটির গঠনে রয়েছে স্পঞ্জের মতো ছিদ্রযুক্ত একটি স্ফটিক কাঠামো, যার সঙ্গে তামা ও সোডিয়াম যুক্ত করা হয়েছে। এই বিশেষ গঠন রাসায়নিক বিক্রিয়াকে কার্যকর করতে সহায়তা করে। এর মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও হাইড্রোজেনের বিক্রিয়ায় মিথানল তৈরি করা সম্ভব হয়।
মঙ্গলে বরফ আকারে পানি থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেই পানি থেকে উপযুক্ত প্রযুক্তির সাহায্যে হাইড্রোজেন সংগ্রহ করা গেলে তা কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করিয়ে জ্বালানি তৈরির কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও শক্তির ব্যবস্থা করা গেলে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল এবং স্থানীয় পানির সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সেখানে জ্বালানি উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
তবে এ প্রক্রিয়া বাস্তবে মঙ্গলে চালু করতে হলে শুধু অনুঘটক তৈরি করলেই হবে না। পানি থেকে হাইড্রোজেন সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান এবং প্রতিকূল পরিবেশে পুরো ব্যবস্থাকে সচল রাখার মতো বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে।
পরীক্ষায় প্রচলিত অনুঘটকের চেয়ে ১১ গুণ বেশি মিথানল
পৃথিবীতে পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষায় নতুন অনুঘটকটির কার্যকারিতা যাচাই করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু তামা ব্যবহার করে তৈরি প্রচলিত অনুঘটকের তুলনায় নতুন অনুঘটকটি ১১ গুণ বেশি মিথানল উৎপাদন করেছে। একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত তৈরির পরিমাণও কমেছে।
গবেষণায় বিভিন্ন ধাতব উপাদানের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা হয়। সেখানে পটাশিয়াম ও সিজিয়ামের তুলনায় সোডিয়াম বেশি কার্যকর ফল দিয়েছে। সোডিয়াম অনুঘটকটির কার্বন ডাই-অক্সাইড আকর্ষণ করার ক্ষমতা বাড়াতে এবং গ্যাসটিকে তামার সক্রিয় অংশের কাছাকাছি ধরে রাখতে সহায়তা করে। এর ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হতে পারে।
পরীক্ষায় প্রতি কেজি অনুঘটক ব্যবহার করে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৪৫ গ্রাম মিথানল উৎপাদন করা হয়েছে। এ ছাড়া টানা ১২ ঘণ্টার পরীক্ষায় অনুঘটকটি কার্যকারিতা বজায় রাখতে পেরেছে।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইডকে ব্যবহার করে সেখানে জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফল বাস্তব মঙ্গলের পরিবেশেও একইভাবে পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
নাসার অক্সিজেন উৎপাদন থেকে মঙ্গলের জ্বালানি পরিকল্পনা
মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। যদিও মানুষবাহী মঙ্গল অভিযানের জন্য এখনো নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত করা হয়নি, গ্রহটিতে মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা চলছে।
এর আগে নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভারে মক্সি নামের টোস্টারের আকারের একটি যন্ত্র পাঠানো হয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে যন্ত্রটি মঙ্গলের কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল থেকে সফলভাবে অক্সিজেন উৎপাদন করে। এই পরীক্ষা দেখিয়েছে, মঙ্গলের পরিবেশে উপস্থিত গ্যাস ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব।
অন্যদিকে, নাসা ও স্পেসএক্সের পরিকল্পনায় মঙ্গলের কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে মিথেন তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মিথেন ব্যবহার করে ভবিষ্যতে পৃথিবীতে ফিরে আসার রকেটের জ্বালানি সরবরাহের ধারণাও রয়েছে।
তবে চীনা গবেষকেরা মিথেনের পরিবর্তে মিথানল উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। এর একটি কারণ হলো, মিথেনকে তরল অবস্থায় রাখতে অত্যন্ত কম তাপমাত্রা প্রয়োজন। ফলে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা দরকার হয়। অন্যদিকে, স্বাভাবিক কক্ষ তাপমাত্রায় মিথানল তরল থাকে। তাই এটি সংরক্ষণ ও বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা দিতে পারে।
মঙ্গল অভিযানে চীনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
মঙ্গল অনুসন্ধানে চীনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২১ সালে তিয়ানওয়েন-১ অভিযানের মাধ্যমে দেশটি মঙ্গলে সফলভাবে মহাকাশযান অবতরণ করায়। এ অভিযানের মাধ্যমে মঙ্গলের পৃষ্ঠে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা প্রদর্শন করে চীন।
এর পরবর্তী বড় লক্ষ্য মঙ্গল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের দিকে তিয়ানওয়েন-৩ অভিযান উৎক্ষেপণের লক্ষ্য রয়েছে। এ অভিযানের মাধ্যমে ২০৩১ সালের দিকে মঙ্গল থেকে অন্তত ৫০০ গ্রাম নমুনা পৃথিবীতে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অভিযানটির প্রধান নকশাবিদ লিউ জিঝং আশা প্রকাশ করেছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে মানবজাতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মঙ্গল থেকে নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার মাইলফলক অর্জিত হবে।
চীনের মঙ্গল গবেষণায় জ্বালানি উৎপাদনের নতুন অনুঘটক উদ্ভাবনও দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেখানে বিদ্যুৎ, তাপ, যানবাহন পরিচালনা ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি হবে।
বাস্তব প্রয়োগের আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে জ্বালানি উৎপাদনের এই প্রযুক্তি এখনো গবেষণা ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। পৃথিবীর পরীক্ষাগারে অনুঘটকটির ভালো ফল পাওয়া গেলেও মঙ্গলের নিম্ন তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, ধুলা এবং অন্যান্য প্রতিকূল পরিবেশে এটি কতটা কার্যকর থাকবে, তা যাচাই করতে হবে।
এ ছাড়া জ্বালানি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় হাইড্রোজেন সংগ্রহ, শক্তির জোগান এবং উৎপাদিত মিথানল নিরাপদে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ সমাধান করা গেলে ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষক ঝাং ঝে ও তাঁর সহকর্মীরাও জানিয়েছেন, এ প্রযুক্তির ব্যবহারিক সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাঁদের উদ্ভাবন আপাতত মঙ্গলে স্বনির্ভর জ্বালানি উৎপাদনের পথে একটি সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
প্রতি / এডি / শাআ



















