ডেভিড অ্যাটেনবোরো: প্রকৃতির বিস্ময় যিনি পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের কাছে

প্রকাশঃ মে ১২, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৫৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

কৈশোর পেরিয়ে তরুণ বয়সে পা রাখা এক যুবকের মনে তখন ঘুরে বেড়ানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষা। সদ্য ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৃতি বিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করেছেন তিনি। পৃথিবীর নানা প্রান্ত, অজানা বনভূমি, সমুদ্র আর প্রাণিজগতকে কাছ থেকে দেখার স্বপ্নই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

কিন্তু সেই সময় ব্রিটেনে তরুণদের জন্য সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক সেবা ছিল নিয়ম। তাই বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন পূরণে তিনি যোগ দেন নৌবাহিনীতে। ভেবেছিলেন, অন্তত সমুদ্রযাত্রার সুযোগ মিলবে। বাস্তবে দেখা গেল, পরিচিত কয়েকটি উপকূলীয় এলাকাতেই কাটছে সময়। বহু প্রতীক্ষিত অভিযাত্রা যেন অধরাই রয়ে গেল।

তবে সেই অপূর্ণ স্বপ্নই একদিন তাকে পৌঁছে দেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন উচ্চতায়। প্রকৃতি ও বন্যজগতের গল্প বলা এক কিংবদন্তিতে পরিণত হন তিনি। তিনি ডেভিড অ্যাটেনবোরো।

প্রকৃতির গল্প বলা এক অনন্য মানুষ

দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যাটেনবোরো পৃথিবীর সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন মানুষের সামনে। তার কণ্ঠে দর্শক ঘুরে এসেছে অস্ট্রেলিয়ার প্রবালপ্রাচীর, আমাজনের বৃষ্টিঅরণ্য, অ্যান্টার্কটিকার বরফরাজ্য কিংবা আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে।

তিনি শুধু প্রাণীদের দেখাননি, তাদের জীবন, সংগ্রাম, সম্পর্ক আর টিকে থাকার গল্পও তুলে ধরেছেন অসাধারণ দক্ষতায়। গ্যালাপাগোসের সামুদ্রিক ইগুয়ানা থেকে শুরু করে আর্কটিক শেয়াল কিংবা সেরেঙ্গেটির ওয়াইল্ডবিস্টের অভিবাসন, সবই তার বর্ণনায় যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

বিবিসিতে শুরুটা সহজ ছিল না

আজ যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত, তার শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। সামরিক জীবন শেষে তিনি একটি শিশুতোষ প্রকাশনা সংস্থায় কাজ শুরু করেন। পরে আবেদন করেন BBC-এ। প্রথম আবেদনেই প্রত্যাখ্যাত হন।

তবে তার জীবনবৃত্তান্ত নজর কাড়ে সম্প্রচার বিভাগের কর্মকর্তা মেরি অ্যাডামসের। তার পরামর্শেই টেলিভিশন বিভাগের জন্য আবেদন করেন অ্যাটেনবোরো।

তখনও পর্যন্ত টেলিভিশন সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা ছিল খুবই সীমিত। এমনকি বিবিসির কিছু কর্মকর্তা মনে করতেন, তার চেহারা টিভি উপস্থাপনার জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে শুরুতে তাকে পর্দার আড়ালেই কাজ করতে হয়।

‘জু কোয়েস্ট’ বদলে দেয় জীবন

১৯৫৪ সালে বিবিসি শুরু করে বন্যপ্রাণীভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘জু কোয়েস্ট’। এই অনুষ্ঠানই অ্যাটেনবোরোর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

প্রথমদিকে তিনি ছিলেন প্রযোজক। পরে মূল উপস্থাপক অসুস্থ হয়ে পড়লে দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। আফ্রিকার সিয়েরা লিওন থেকে দুর্লভ প্রাণী ও পাখির খোঁজে অভিযান চালিয়ে দর্শকদের সামনে এক নতুন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।

সেই শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

‘লাইফ অন আর্থ’ থেকে বিশ্বজয়

১৯৭৯ সালে প্রচারিত ‘লাইফ অন আর্থ’ অ্যাটেনবোরোকে পৌঁছে দেয় বিশ্বজুড়ে অসাধারণ জনপ্রিয়তায়। কোটি কোটি দর্শক প্রথমবারের মতো এত কাছ থেকে দেখেছিল পৃথিবীর প্রাণবৈচিত্র্য।

পরবর্তীতে তিনি একের পর এক নির্মাণ করেন ‘দ্য লিভিং প্ল্যানেট’, ‘লাইফ ইন ফ্রিজার’, ‘লাইফ অব বার্ডস’, ‘লাইফ অব প্ল্যান্টস’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজ।

প্রতিটি তথ্যচিত্রে ছিল প্রকৃতি, বিজ্ঞান আর গল্প বলার অনন্য মিশ্রণ।

প্রশাসনের চেয়ে প্রকৃতিকেই বেছে নিয়েছিলেন

একসময় তাকে বিবিসির শীর্ষ প্রশাসনিক পদে বসানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অ্যাটেনবোরো সেই পথ বেছে নেননি। তিনি চেয়েছিলেন আবারও ক্যামেরা নিয়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে।

তার কাছে পদ বা ক্ষমতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পৃথিবীর অজানা সৌন্দর্য মানুষের সামনে তুলে ধরা।

শত বছরেও অমলিন কৌতূহল

২০২৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ওশান’ তথ্যচিত্রেও তিনি সমুদ্রজগতের বিস্ময় তুলে ধরেছেন নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে।

আজ শতবর্ষ পেরিয়েও প্রকৃতির প্রতি তার আগ্রহ কমেনি। ছোট একটি পাতা, সকালের আলো কিংবা পাখির ডাকেও তিনি খুঁজে পান বিস্ময়।

বিশ্বের নানা প্রান্ত ঘুরে বেড়ানো এই কিংবদন্তির সবচেয়ে প্রিয় জায়গা এখনো লন্ডনের শান্ত উপশহর রিচমন্ড, যেখানে বহু বছর ধরে বসবাস করছেন তিনি।

ডেভিড অ্যাটেনবোরো শুধু একজন উপস্থাপক নন, তিনি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া এক বিরল মানুষ। তার কণ্ঠে পৃথিবীকে নতুনভাবে চিনেছে কোটি কোটি মানুষ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G