ইতিহাসের স্বাক্ষী আনন্দ মোহন কলেজ

প্রকাশঃ জানুয়ারি ২১, ২০১৫ সময়ঃ ৫:৫৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৫:৫৫ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক, প্রতিক্ষণ ডট কমঃ

আনন্দআনন্দ মোহন কলেজ  বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী কলেজ। উপমহাদেশের প্রথম র‌্যাংলার (wrangler), বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক  আনন্দমোহন বসু  (১৮৪৭-১৯০৬) প্রথম ময়মনসিংহ শহরের রাম বাবু রোডে তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে ‘ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউশন’ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮৯০ সালের এপ্রিল মাস থেকে ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউটশন-এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট স্কুল’। ১৮৯৯ সালে ‘ময়মনসিংহ সভা’ এবং ‘আঞ্জুমানে ইসলামিয়া’-এর যৌথ আবেদনে ময়মনসিংহে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হলে আনন্দমোহন বসু ১৯০১ সালের ১৮ জুলাই সিটি কলেজিয়েট স্কুলকে ‘ময়মনসিংহ সিটি কলেজ’ নামে দ্বিতীয় গ্রেডের কলেজে রূপান্তরিত করেন এবং কলকাতা সিটি কলেজের সাথে সংযুক্ত করেন।

কার্যত কলেজটি ছিল কলকাতা সিটি কলেজের শাখাস্বরূপ। প্রাথমিক অবস্থায় কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিলের আর্থিক সহযোগিতায় ময়মনসিংহ সিটি কলেজ পরিচালিত হতো। ১৯০২ সালের এপ্রিল মাসে ময়মনসিংহ সিটি কলেজ  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দ্বিতীয় গ্রেডের কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ।

১৯০৬ সালে আনন্দমোহন বসুর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিল অর্থনৈতিক কারণে ময়মনসিংহ সিটি কলেজকে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বিযুক্তকরণের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট সুপারিশ করে।

১৯০৮ সালের ৩১ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা সিটি কলেজ থেকে ময়মনসিংহ সিটি কলেজের সংযুক্তি সম্পূর্ণরূপে রহিত করে। এ পরিস্থিতিতে ময়মনসিংহ সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল বৈকুণ্ঠ কিশোর চক্রবর্তী এবং ময়মনসিংহের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. ব্যাক উড কলেজটির পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও উদ্যমশীল ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নতুন কমিটি গঠন করেন।

প্রাথমিকভাবে এই কমিটি ময়মনসিংহ সিটি কলেজের পরিচালনা ও যাবতীয় খরচের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং এর নাম পরিবর্তন করে ‘ময়মনসিংহ কলেজ’ রাখে।

কমিটির আবেদনের ফলে ময়মনসিংহ কলেজ ১৯০৮ সালের ২৩ জুন পুনরায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। কমিটি সরকারের গ্র্যান্ট-ইন-এইড-এর আওতায় অর্থ সাহায্য প্রদানের জন্য বিভাগীয় কমিশনার রবার্ট নাথনের সাথে সাক্ষাত করে এবং পাশপাশি স্থানীয় জমিদার ও বিত্তশালীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করে।

ময়মনসিংহ কলেজের জন্য নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রচেষ্টা শুরু হয়। নতুন জমি না পাওয়া পর্যন্ত প্রাক্তন সিটি কলেজ ভবনেই ময়মনসিংহ কলেজের কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৯০৮ সালের শেষ দিকে কলেজকে কাঁচিঝুলিতে বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয় এবং পুনরায় কলেজের নাম পরিবর্তন করে আনন্দমোহন বসুর নামানুসারে ‘আনন্দমোহন কলেজ’ রাখা হয়।

১৯০৮ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আনন্দ মোহন কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়।

১৯৬৩ সাল পর্যন্ত আনন্দমোহন কলেজ বেসরকারি কলেজ ছিল। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে কলেজটি সরকারি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং কলেজের নামকরণ করা হয় সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ।

এই সময়ে কলেজের বাংলা ও ইতিহাস বিভাগে অনার্স কোর্স প্রবর্তিত হয় এবং কলেজ ভবনকে সম্প্রসারণ করা হয়। দ্বিতল একাডেমিক ভবন, অডিটরিয়াম, ছাত্র মিলনায়তন এবং দোতলায়  গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়।

পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালে আরো কয়েকটি বিভাগে অনার্স কোর্স প্রবর্তন করা হয়। সর্বশেষ ৯০ দশকে বাকি সকল বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স প্রবর্তন করা হয়। এই দশকেই কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় এবং এর নতুন চারতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়।

বর্তমানে কলেজটিতে ১৮টি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। বিষয়গুলি হচ্ছে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, দর্শন, ইসলামিক স্টাডিজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ, সমাজ বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণি বিজ্ঞান, গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, ভূগোল ও পরিবেশ এবং ব্যবস্থাপনা ও হিসাববিজ্ঞান।

অধ্যক্ষ ভবন, শিক্ষকদের আবাস, কর্মচারীদের আবাস, অতিথি ভবন,  শহীদ মিনার, পৃথক ছাত্রছাত্রী মিলনায়তন, পোস্ট অফিস, বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, টেলিফোন বুথ,  রূপালী ব্যাংক লিমিটেড বুথ, মসজিদ, বাস ও মাইক্রোবাস, খেলার মাঠ, পুকুর, ছাত্রদের ৩টি ও ছাত্রীদের ২টি হোস্টেল, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বিভাগীয় গবেষণাগার নিয়ে আনন্দমোহন কলেজের ক্যাম্পাস মোট ১৫.২৮ একর স্থান জুড়ে অবস্থিত।

কলেজে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য কল্যাণ তহবিল এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। কলেজে কমিশনপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অধীনে বিএনসিসি ইউনিট এবং রোভার স্কাউট ও গার্লস গাইড পরিচালিত হয়। বর্তমানে কলেজে অনুমোদিত শিক্ষক পদের সংখ্যা ২০১ এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার।

কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং আর্ন্তজাতিক সামরিক আদালতের অন্যতম বিচারক রাধাবিনোধ পাল ১৯১১-১৯২০ সালে এই কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ইতিহাসবিদ প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম এবং লেখক ড. সফিউদ্দিন আনন্দমোহন কলেজে শিক্ষকতা করেন।

এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন ইতিহাসবিদ ড.নীহার রঞ্জন রায়,  প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, ঔপন্যাসিক  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, যাদুকর  পি.সি সরকার, প্রফেসর মোফাখখারুল ইসলাম (সাবেক উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়), প্রফেসর মো. আনোয়ারুল ইসলাম (সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক ড. অরবিন্দু পোদ্দার, প্রফেসর মো. শামসুর রহমান (সাবেক উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়), বিচারপতি এম.এ রশিদ, রাহাত খান সম্পাদক  দৈনিক ইত্তেফাক, যতীন সরকার বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক, কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখ গুণী ব্যক্তি। [তথ্য সূত্রঃবংলা পিডিয়া]

প্রতিক্ষণ/এডি/সাইমুম

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G