নজরুলকে সালাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিক্ষণ ডটকম:
কাজী নজরুল ইসলামকে আমার প্রণাম জানাই। প্রণাম জানাই কবিতার সেই উন্মাদনাকে যা খুব অল্প অংশে পেলেও একজন মানুষ আজীবন কবিপরিচয় থেকে মুক্তি চায় না। এক প্রেমিক আগ্নেয়গিরিকে আমি প্রণাম জানাই। প্রণাম জানাই মিঠা জলের সেই ভয়ানক উত্তপ্ত সাগরকে, জাহাজকে যে ভালবাসে, কিন্তু জাহাজকে নোঙর ফেলার স্পর্ধা দেয় না।
মনে আছে কৈশোরের সেই দিনগুলো। হাতে পেয়েছিলাম ‘সঞ্চিতা’। মনে আছে বুঁদ হয়ে থাকতাম। বিশেষ করে ‘সাম্যবাদী’র কবিতাগুলো। মনে আছে রক্ত টগবগ করত।
আফসোস হতো, কেন ইংরেজ দেশ ছেড়ে চলে গেল, আমার বলিদানের অপেক্ষা করল না! সেই যে বুঝেছিলাম উচ্চারণের শক্তি, আজও তার রেশ মনে লেগে আছে। নজরুল আমার ভালবাসার কবি। আমার কোনোদিন না হতে পারার নাম নজরুল।
ওর প্রেমের লেখা পড়লে বাংলা কবিতার যে কোনো কবিকে রক্তশূন্য মনে হয়।…“আলগা করগো খোঁপার বাঁধন, দেল ওহি মেরা ফাঁস গেয়ি” … কে লিখবেন বলুন তো?ওর কবিতা যে কোনো তাত্বিকতার বাইরে। যদি কেউ ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সঙ্গে জাঁ পল সার্ত্রকে মিলিয়ে দেখতে চায়, সে মূঢ়। কোনো মানে হয় না ওই প্রয়াসের। একটা মানুষের বাঁচা, তার বাঁচতে চাওয়া, তার স্পর্ধা এবং অবরুদ্ধতা… ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পড়ার পরে মনে হয় একটা আশ্চর্য আমার সামনে দিয়ে বয়ে গেল, একজন বীরের জীবন, যে কবচ-কুন্ডল নিয়ে জন্মায়নি, তার রথে চাকা মেদিনী গ্রাস করতেই পারে, কিন্তু যুদ্ধটা সে করবে। তার আস্ফালন… হাস্যকরতাকে হাস্যকর করে তোলে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় আমার।
একটা ‘বিদ্রোহী’ লেখার পরে আর কিছু না লিখলেও তার হত। ওই কবিতার স্বকীয়তার প্রতি মোহিতলাল মজুমদারের দাবি মাথায় রেখেই বলছি, আর কিছু নজরুলের না লিখলেও চলত। কিন্তু সীমাহীন কবিত্ব নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন। তার ত্রাণ ছিল না। একটি নক্ষত্র যেমন অকাতরে নিজের শক্তিকে নিঃশেষ করে, নজরুলও তাই করেছিলেন। অত না লিখলেও তার কি চলত? চলত না। নিজেকে তাহলে তিনি কোথায় ফুরোতেন? এই দিক থেকে তার সঙ্গে তুলনীয় আরেকটি নামই আছে, তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। দুজনেই এসেছিলেন কবিত্বের অতিরেক নিয়ে, ফুরোতে ফুরোতে তারা চলেছিলেন, আবার বলছি নক্ষত্রদের মতো।
আজ নজরুল ইসলামের কবিতা কেউ জাঁক করে পড়ে না। জীবনানন্দকে পড়ার মধ্যে যে শ্লাঘা আছে, তাকে পড়ার মধ্যে বুঝি নেই। অথচ জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এ নজরুলের দস্তুরমতো প্রভাব ছিল। তাকে এক সরলচিত্ত কবি হিসেবেই সবাই চিহ্নিত করতে চান। এই আমাদের অভিশাপ। একজন হোসে মার্তি বা লোরকার যা-যা প্রাপ্য, নজরুলের তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা ছিল না। আধুনিকতার ভুল এবগ অবক্ষয়ী ব্যাখ্যা এই মহান কবিকে সিরিয়াস আলোচনা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কবিতার স্বভাবজ স্বাদে আজ আমরা সন্তুষ্ট নই। নজরুল আমাদের কৃত্রিম আধুনিকতার পক্ষে বিপজ্জনক, সন্তোষজনক নন।
প্রতিক্ষণ/এডি/রানা…লেখক:অনুপম
























