নতুন সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশের গাড়িশিল্প

প্রকাশঃ জুলাই ২৬, ২০২৬ সময়ঃ ১০:১১ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:১৩ অপরাহ্ণ

একসময় বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন পুরোপুরি ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনচালিত যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গত কয়েক দশকে দেশে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বায়ুদূষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। ফলে পরিবহন খাতে টেকসই বিকল্পের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন খাত দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য দায়ী। একই সঙ্গে বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও প্রভাব ফেলছে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার এখন বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) শিল্পকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যানবাহন বিদ্যুৎচালিত করার লক্ষ্য সামনে রেখে একের পর এক নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় শিল্প মন্ত্রণালয় ইভি শিল্প উন্নয়ন নীতি চূড়ান্ত করেছে। এতে স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি উৎপাদনকারীদের দীর্ঘমেয়াদি করসুবিধা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ির বহরে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইভি অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা এবং দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করার নানা প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ইভি খাতকে উৎসাহ দিতে একাধিক করছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে অধিকাংশ শুল্ক প্রত্যাহার, চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং দেশীয়ভাবে সংযোজিত ইভির ওপর ভ্যাট কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ওপর শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে।

সরকারি নীতিসহায়তার ফলে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক গাড়ি বাংলাদেশের বাজারে এসেছে। একই সঙ্গে ইভি মোটরসাইকেল ও স্কুটারের বাজারও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি নয়, গণপরিবহন ও ছোট যানবাহনেও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত ই-রিকশা চালুর পরীক্ষামূলক প্রকল্প, বৈদ্যুতিক স্কুলবাস আমদানিতে বিশেষ সুবিধা এবং নিরাপদ পরিচালনার জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজও চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও ইভি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে ঋণসুবিধা বাড়িয়েছে। বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বৃদ্ধি এবং ডাউন পেমেন্টের চাপ কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে সাধারণ ক্রেতারাও সহজে এসব যানবাহন কিনতে পারেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশে বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি ইভি আমদানির সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য কেবল বিদেশ থেকে গাড়ি আনা নয়, বরং ভবিষ্যতে দেশেই বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয়ভাবে ইভি উৎপাদন শুরু হলে একদিকে যেমন জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমবে, অন্যদিকে নতুন শিল্পকারখানা, চার্জিং অবকাঠামো, সার্ভিস সেন্টার ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের মাধ্যমে হাজারো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

সব মিলিয়ে করসুবিধা, সহজ অর্থায়ন, নতুন বিনিয়োগ এবং গ্রাহকদের বাড়তে থাকা আগ্রহ দেশের ইভি খাতকে নতুন গতি দিচ্ছে। নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারই নয়, উৎপাদন ও রপ্তানিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

July 2026
SSMTWTF
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
20G