বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগে নতুন দিগন্ত, লাখো কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের (চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন) নির্মাণ কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নের নানা ধাপ অতিক্রম করে অবশেষে বাস্তবায়নের পথে যাচ্ছে এই বহুল আলোচিত প্রকল্প।
প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চলের গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে আশা করছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধান অতিথি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ানসহ দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কেবল একটি শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ শুরুর অনুষ্ঠান নয়; বরং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ায় প্রকল্পটি ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বেড়েছে।
প্রকল্পটির ধারণা আসে বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) সহযোগিতার ভিত্তিতে। ২০১৪ সালে সমঝোতা হলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অর্থায়নসংক্রান্ত কারণে দীর্ঘ সময় প্রকল্পটি এগোতে পারেনি। পরে ২০২২ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে দায়িত্ব পায়। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেজা ও সিআরবিসির মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের গতি পায়।
একই সফরে মোংলা বন্দরের পাশে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) চীনের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রচার সংস্থা সিসিপিআইটির সঙ্গে বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধির চুক্তিও করে।
এ ছাড়া কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের ২২ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগও সাম্প্রতিক সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন রয়েছে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ আসবে চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট থেকে।
এই প্রকল্পের আওতায় বহুমুখী জেটি, সংযোগ সড়ক ও সেতু, চার লেনের সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ আধুনিক শিল্পাঞ্চলের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বস্ত্রশিল্প, প্রযুক্তিনির্ভর তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, মেডিক্যাল ডিভাইস এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে উঠবে।
বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পটি পাঁচ বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও প্রথম তিন বছরের মধ্যেই প্রায় ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্প ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনা বিনিয়োগের প্রবণতাও ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বেপজার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাক্ষরিত ৩৬টি ভূমি ইজারা চুক্তির মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানই চীনা মালিকানাধীন বা চীনের যৌথ উদ্যোগ। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার।
শুধু পোশাক খাত নয়, ড্রোন প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, মেডিক্যাল ডিভাইস, কপারজাত পণ্য, লজিস্টিকস ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিতেও চীনা বিনিয়োগ বাড়ছে।
বিডার তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৯২১ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে আনোয়ারাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে।
কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে আনোয়ারা এখন সরাসরি চট্টগ্রাম নগরী ও জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কাছাকাছি হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি, পণ্য রপ্তানি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যাতায়াতে বিশেষ সুবিধা মিলবে। এই ভৌগোলিক অবস্থান প্রকল্পটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে আনোয়ারা ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, এই শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম শিল্প ও বিনিয়োগের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে এবং স্থানীয় তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিন উদ্দীন জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সফলভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের নতুন মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রতি / এডি / শাআ























