সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও হুতিদের হারানো সৌদি আরবের জন্য কঠিন কেন?
সামরিক সরঞ্জাম, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দিক থেকে সৌদি আরব অনেক শক্তিশালী। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যও দেশটির রয়েছে। যুদ্ধের কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলেও তা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা সৌদি সরকারের আছে। তারপরও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সম্পূর্ণ পরাস্ত করা রিয়াদের জন্য সহজ হবে না। কারণ, এই সংঘাতের সমাধান কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সম্প্রতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার কথা বলেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আলোচনায় হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন সরাসরি হামলায় অংশ নিতে রাজি না হলেও গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
এই ঘটনা সৌদি আরবের সামরিক দুর্বলতার চেয়ে বড় একটি কৌশলগত বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও তাদের কাছ থেকে সৃষ্ট নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা কঠিন। রিয়াদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ সুরক্ষিত রাখা।
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের মোখা বন্দর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে উদ্বেগও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সময়ে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে তেল পরিবহনের জন্য তৈরি এই পাইপলাইন দেশটির জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সৌদি আরবের জন্য সমস্যাটি তাই শুধু হুতিদের সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়। দেশটির অর্থনীতি ও জ্বালানি রপ্তানি যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং নৌপথের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামরিক শক্তিতে সৌদি আরব এগিয়ে, কিন্তু জয় নিশ্চিত নয়
প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বিচারে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। সৌদি আরবের রয়েছে উন্নত যুদ্ধবিমান, নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ।
২০২৫ সালে সৌদি আরবের সামরিক ব্যয় আনুমানিক ৮ হাজার ৩২০ কোটি ডলার ছিল বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। সামরিক ব্যয়ের বৈশ্বিক তালিকায় দেশটির অবস্থান ছিল অষ্টম।
অন্যদিকে হুতিরা ইয়েমেনভিত্তিক একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক-সামরিক গোষ্ঠী। তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য সৌদি আরবের তুলনায় অনেক কম। তবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশলে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরব সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। দেশটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে পুনরায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা। দীর্ঘ সময় ধরে বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান চালানো হলেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সমাধান আসেনি।
এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়া আর প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে পরাস্ত করা এক বিষয় নয়। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি দুর্গম এলাকায় ছড়িয়ে থেকে নিজেদের সংগঠিত রাখতে পারে, অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করতে পারে এবং অসম যুদ্ধের কৌশল অনুসরণ করে, তাহলে শুধু বিমান হামলা দিয়ে তাকে নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গত এক দশকে হুতিরা এই বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধে সৌদি বাহিনীর মোকাবিলা করার পরিবর্তে তারা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকস্মিক হামলার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে বদলে গেছে যুদ্ধের ধরন
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে হুতিরা প্রায় এক হাজার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। একই সময়ে ৩৫০টির বেশি পৃথক ড্রোন হামলার তথ্যও পাওয়া যায়।
সময়ের সঙ্গে হুতিদের অস্ত্র ব্যবহারের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে তাদের রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রায় ১৫ শতাংশে নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০২২ সালে এ হার বেড়ে ৮৯ শতাংশে পৌঁছায়। পাশাপাশি ড্রোনের ব্যবহারও বাড়তে থাকে।
এতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। কারণ, হুতিদের অস্ত্রের উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করা গেলেও তাদের সব ধরনের হামলা একসঙ্গে বন্ধ করা কঠিন। একটি ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতে পারে। আবার একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আঘাত হানলে তার অর্থনৈতিক ক্ষতি সামরিক ক্ষতির চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি আরবের সামরিক অভিযানের প্রধান লক্ষ্য ছিল হুতিদের অস্ত্র ও সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করে তাদের আক্রমণক্ষমতা কমানো। বিপরীতে হুতিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ঝুঁকির মুখে রেখে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে।
এই দুই কৌশলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সৌদি আরব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা কৌশলগত অবস্থান শুধু বোমা হামলা দিয়ে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা এই দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছিল। ওই হামলার পর দেশটির তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে অর্ধেকের বেশি কমে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
হামলাটি ঠিক কোথা থেকে পরিচালিত হয়েছিল এবং কারা সরাসরি দায়ী ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর কৌশলগত শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক কম ব্যয়ের অস্ত্র ব্যবহার করেও একটি শক্তিশালী দেশের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষতি করা সম্ভব।
তাই সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবকে সব ধরনের হামলা থেকে সুরক্ষিত বলা যায় না।
বাব আল-মানদেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান। দেশটির পশ্চিম উপকূল লোহিত সাগরের পাশে অবস্থিত। এই অঞ্চলের কাছেই রয়েছে বাব আল-মানদেব প্রণালি, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
এই নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাহাজ চলাচলের খরচ বেড়ে যেতে পারে, বীমার প্রিমিয়াম বাড়তে পারে এবং অনেক জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল করতে হতে পারে। ফলে কোনো বন্দর বা জাহাজ সরাসরি দখল না করেও এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলা সম্ভব।
হুতিদের অবস্থান সৌদি আরবের জন্য এ কারণেই উদ্বেগের। ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক হামলার সক্ষমতা আঞ্চলিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে মোখা বন্দর বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেকোনো নির্দিষ্ট দাবি প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ সূত্র দিয়ে তা যাচাই
প্রতি / এডি / শাআ



















