১৭ বছরে ৩১.৫ ইঞ্চি সরে গেছে পৃথিবীর অক্ষ
পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুর মতো পানিরও নির্দিষ্ট ওজন রয়েছে। মানুষ প্রতিদিন মাটির নিচ থেকে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি তুলে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে। পরে সেই পানি নদীপথে সাগরে গিয়ে মিশছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিশাল পানি স্থানান্তরের কারণে পৃথিবীর ওজনের ভারসাম্যে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটছে, যা প্রভাব ফেলছে গ্রহটির ঘূর্ণন অক্ষের ওপরও।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৩ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। এই সময়ের মধ্যে মেরু দুটি প্রায় ৩১ দশমিক ৫ ইঞ্চি বা প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার সরে গেছে।
২০২৩ সালে ‘জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে। গবেষকদের হিসাবে, ওই ১৭ বছরে পৃথিবী থেকে প্রায় ২ হাজার ১৫০ গিগাটন ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়েছে। এক গিগাটন সমান প্রায় ১০০ কোটি টন।
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ঘূর্ণন ও মেরুর অবস্থান বিশ্লেষণের গাণিতিক মডেলে এই পানি স্থানান্তরের তথ্য যুক্ত করার পর দেখতে পান, হিসাব বাস্তব পরিবর্তনের সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি মিলছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, উত্তোলিত পানি শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে জমা হওয়ায় বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বেড়েছে। হিসাব অনুযায়ী, এ কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬ দশমিক ২৪ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, পৃথিবী একদম স্থিরভাবে ঘোরে না। এটি কিছুটা দুলতে দুলতে নিজের অক্ষে আবর্তিত হয়। ফলে পৃথিবীর এক অংশ থেকে অন্য অংশে অতিরিক্ত ওজন সরে গেলে ঘূর্ণনের ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসে।
নাসা আগেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে লাটিমের উদাহরণ দিয়েছিল। লাটিমের একপাশে অতিরিক্ত ওজন দিলে যেমন সেটি ভারসাম্য হারিয়ে দুলতে থাকে, পৃথিবীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাব দেখা যায়।
গবেষণাটির প্রধান বিজ্ঞানী কি-ওন সিও বলেন, মেরুর সরে যাওয়ার কারণ শনাক্ত করতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার বিষয়টি উদ্বেগের।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর বিষুবরেখা ও মেরুর মাঝামাঝি অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করলে ঘূর্ণন অক্ষে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ভারত ও উত্তর আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এই পরিবর্তনের বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তবে সব গবেষণা একই ফল দেখাচ্ছে না। ২০২৬ সালে ‘জার্নাল অব জিওডেসি’-তে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর অক্ষ পরিবর্তনের পেছনে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলা ও তুষারপাতের পরিবর্তনের ভূমিকাও বড়।
এখন বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট তথ্য ও আধুনিক ডেটাবেজ ব্যবহার করে পৃথিবীর পানির ভারসাম্যের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বিশ্লেষণ করছেন। ‘TWSTORE’ ও ‘ML-TWiX’ নামের ডেটাবেজের মাধ্যমে গত কয়েক দশকের পানির ওঠানামার বিস্তারিত চিত্র তৈরির চেষ্টা চলছে।
গবেষকদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানি, বরফ গলা, হিমবাহের পরিবর্তন এবং ভূতাত্ত্বিক নানা প্রক্রিয়া একসঙ্গে পৃথিবীর ঘূর্ণন ও অক্ষের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। তাই পুরো বিষয়টি নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
প্রতি / এডি / শাআ









