জনসংখ্যার চাপে বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, বাড়ছে নগর সংকট
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসকে সামনে রেখে ‘তরুণদের আশা–আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’ প্রতিপাদ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী ও প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা ও দখল, জলাবদ্ধতা, আবাসন সংকট, যানজট, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশগত ঝুঁকিসহ নানা জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনাকারী চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অভিবাসনও বেড়েছে। শিল্পাঞ্চল, বন্দর, ইপিজেড ও কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ চট্টগ্রামে আসছেন। ফলে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি অনেক বেশি হওয়ায় নগরজীবনের প্রায় প্রতিটি খাতেই চাপ বাড়ছে।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা সভা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।
সরকারি জনশুমারি ও গৃহগণনা–২০২২ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লাখ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৯১ লাখ, যা দেশের অন্যতম জনবহুল জেলা। জেলার বড় একটি অংশ নগর এলাকায় বসবাস করে। অন্যদিকে, জনশুমারিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ উল্লেখ থাকলেও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে বাস্তবে এ সংখ্যা ৭০ লাখেরও বেশি হতে পারে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও একই ধরনের ধারণা পোষণ করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে কয়েক হাজার মানুষ। তবে আগ্রাবাদ, হালিশহর, খুলশী, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালী, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, বন্দর, পাহাড়তলী ও ইপিজেডসংলগ্ন এলাকায় জনঘনত্ব গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিদিন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসার প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতে নগর অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান কারণ জন্মহার নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় তৈরি পোশাক, ইস্পাত, শিপ ব্রেকিং, জাহাজ নির্মাণ, সিমেন্ট, রিফাইনারি, বন্দর, পরিবহন, নির্মাণ ও সেবাখাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব সুযোগের টানে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে বসবাস শুরু করছেন। ফলে পরিকল্পনার বাইরে নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম বড় সংকট অপরিকল্পিত আবাসন। সরকারি হিসাবে এখনও হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করছেন। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পাশাপাশি খাল, জলাশয় ও নিচু এলাকা ভরাট করে গড়ে ওঠা বসতি জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলছে। ভারী বৃষ্টিতে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা বারবার প্লাবিত হওয়ার পেছনেও জনসংখ্যার চাপ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ হয়নি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। শুধু চট্টগ্রাম নয়, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে আসেন। এতে স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষা, গণপরিবহন, বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নগরসেবার প্রতিটি খাতেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট। সড়ক সম্প্রসারণের তুলনায় যানবাহন ও মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় যানজট এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের সমস্যা। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ, বায়ুদূষণ এবং সবুজায়ন কমে যাওয়ার বিষয়ও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এজন্য মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জোরদার এবং জনসংখ্যার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
চট্টগ্রামে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমানো, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা, র্যালি, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আয়োজনও করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি চট্টগ্রামকে টেকসই ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, সম্পদে পরিণত করার পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় নগর পরিকল্পনা, আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার না হলে ভবিষ্যতে নগরীর ওপর চাপ আরও বাড়বে।
উল্লেখ্য, জনসংখ্যা ইস্যুতে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে গুরুত্ব আরোপের লক্ষ্যে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়।
প্রতি / এডি / শাআ













