কারাগারে তৈরি হচ্ছে ‘প্রিজন ফ্রেশ’ নামে সাবান

প্রকাশঃ জুলাই ২৫, ২০২৬ সময়ঃ ১১:৫৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থাকে আরও পুনর্বাসনমুখী ও উৎপাদনভিত্তিক করার উদ্যোগ হিসেবে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে চালু হয়েছে একটি আধুনিক সাবান উৎপাদন কারখানা। সেখানে বন্দিদের অংশগ্রহণে তৈরি হচ্ছে ‘প্রিজন ফ্রেশ’ নামে নতুন ব্র্যান্ডের সাবান। এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু পণ্য উৎপাদন নয়, বরং বন্দিদের দক্ষ করে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং মুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করা।

সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এ কারখানায় বর্তমানে তিন ধরনের সাবান উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত বন্দিরা কারাভোগের সময়কে কাজে লাগিয়ে শিল্প-কারখানার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নিয়মিত পারিশ্রমিকও পাচ্ছেন। এতে মুক্তির পর চাকরি বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

কারখানাটি সম্পূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। নির্ধারিত অনুপাতে কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান মিশিয়ে প্রথমে সাবানের মিশ্রণ তৈরি করা হয়। পরে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে সেই মিশ্রণ প্রক্রিয়াজাত করে নির্দিষ্ট আকৃতিতে সাবান তৈরি করা হয়। এরপর প্রতিটি সাবানে ব্র্যান্ডের ছাপ বসিয়ে উন্নতমানের মোড়কে প্যাকেজিং সম্পন্ন করা হয়।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ জানান, বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ পিস সাবান উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব সাবান দেশের বিভিন্ন কারাগারের বন্দি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হবে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে বাজারেও বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিজস্ব উৎপাদনের ফলে কারা বিভাগের ব্যয় কমবে এবং অতিরিক্ত আয় থেকে বন্দিদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো সম্ভব হবে।

কারখানায় কাজের মাধ্যমে বন্দিরা যন্ত্র পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, প্যাকেজিং এবং শিল্প নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। এসব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে তাদের কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ প্রকল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বন্দিদের পারিশ্রমিক। কারখানায় কাজ করে তারা মাসে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। উপার্জিত অর্থের একটি অংশ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করার পাশাপাশি পরিবারের কাছেও পাঠানোর সুযোগ রয়েছে, যা তাদের স্বজনদের আর্থিক সহায়তা দিতে ভূমিকা রাখছে।

একজন অংশগ্রহণকারী বন্দি বলেন, কারাগারে বসে শুধু সময় কাটছে না, নতুন একটি পেশাগত দক্ষতাও অর্জন করছেন তারা। মুক্তির পর এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে তিন ধরনের সাবান উৎপাদন করা হচ্ছে। শুরুতে কারাগুলোর নিজস্ব চাহিদা পূরণ করা হবে। পরে উৎপাদন বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের কাছেও সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ‘প্রিজন ফ্রেশ’ সাবানের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা।

বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ পিস সাবানের প্রয়োজন হয়। নিজস্ব উৎপাদন শুরু হলে বাইরে থেকে সাবান কেনার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সরকারের রাজস্ব ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় হবে।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন বলেন, কারাগারকে শুধু বন্দিদের আবাসস্থল হিসেবে নয়, বরং দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

কারা প্রশাসনের আশা, কাশিমপুরে এই উদ্যোগ সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারেও একই ধরনের শিল্পভিত্তিক প্রকল্প চালু করা হবে। এতে বন্দিদের পুনর্বাসন সহজ হওয়ার পাশাপাশি অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও কমবে এবং একটি আধুনিক, মানবিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G