গবেষণায় সব ধরনের সয়াবিন তেলে মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

প্রকাশঃ জুলাই ৩০, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৫৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডেড ও খোলা, উভয় ধরনের সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড এনালাইসিস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, খোলা বা নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ ব্র্যান্ডেড তেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেকের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষক দল। এতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর গবেষকরাও অংশ নেন। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশে সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা। গবেষণাপত্রটি ২০২৬ সালের এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার জন্য ঢাকার বিভিন্ন সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে তিনটি ব্র্যান্ডেড এবং তিনটি নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলের মোট ৬০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনা সলভেন্ট ডাইলিউশন, স্টেরিও মাইক্রোস্কোপ, ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কপি (FTIR) এবং স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ (SEM) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি (±১০ হাজার ৫১০) মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। এর মধ্যে নন-ব্র্যান্ডেড তেলে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি এবং ব্র্যান্ডেড তেলে ৪৮ হাজার ৬৭টি কণা শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষণে আরও জানা যায়, শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রায় ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল আঁশ বা ফাইবারজাতীয়। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটার আকারের কণা, যা মোট কণার প্রায় ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এছাড়া স্বচ্ছ রঙের কণার আধিক্য ছিল, যার হার ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এফটিআইআর বিশ্লেষণে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (LDPE), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (HDPE), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (PET), পলিইউরেথেন (PU) এবং নাইলন। গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে প্রথমবারের মতো পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্র্যান্ডেড তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অন্যদিকে খোলা তেলে তুলনামূলক বড় আকারের প্লাস্টিক কণা বেশি পাওয়া গেছে, যা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।

স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নে গবেষকেরা ধারণা দিয়েছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধু সয়াবিন তেল ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরও বেশি, প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা। দীর্ঘমেয়াদে একজন প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে প্রায় ৪ লাখ ৭৭ হাজার এবং একজন শিশুর শরীরে ২০ লাখের বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।

তবে গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দূষণের সামগ্রিক ঝুঁকি মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমাতে ভোজ্যতেলের উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত মান পরীক্ষা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ রান্নায় সয়াবিন তেল ব্যবহার করেন। তাই ভোজ্যতেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য বিশ্লেষক মাহবুবুর কবির মিলনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, সয়াবিন তেলের পাশাপাশি সরিষা, রাইস ব্র্যান, পাম ও সূর্যমুখী তেলসহ অন্যান্য ভোজ্যতেলেও একই ধরনের পরীক্ষা চালানো প্রয়োজন।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

July 2026
SSMTWTF
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
20G