কর ফাঁকি ধরতে এনবিআরের নতুন কৌশল, ‘জাদুর চাবিকাঠি’ হবে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্য
করদাতার দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে কর আদায়ের প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন পরিকল্পনায় করদাতার ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেন, গাড়ি কেনা, জমি-ফ্ল্যাট, বিদেশ ভ্রমণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি রিটার্নে কত আয় দেখিয়েছেন, বাস্তবে তাঁর আর্থিক সক্ষমতা কতটা, জীবনযাত্রার ধরন কেমন এবং বিভিন্ন খাতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন, এসব তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় বিশ্লেষণ করতে চায় রাজস্ব প্রশাসন।
শুধু ব্যক্তি করদাতা নয়, বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের তথ্যনির্ভর পদ্ধতি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান কত কাঁচামাল আমদানি করছে, স্থানীয়ভাবে কত উপকরণ কিনছে, উৎপাদন ক্ষমতা কত, বাজারে তাদের অবস্থান কী এবং এর বিপরীতে কত কর ও ভ্যাট পরিশোধ করছে, এসব তথ্যও পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করা হবে।
এর ফলে কর ফাঁকি শনাক্তের ক্ষেত্রে মূল গুরুত্ব পাবে তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য খুঁজে বের করা। এনবিআরের ধারণা, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উৎসের তথ্য এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণ করতে পারলে করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আয় গোপনকারীদেরও শনাক্ত করা সহজ হবে।
ঘোষিত আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার মিল আছে কি?
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে করদাতাদের জন্য একটি সমন্বিত প্রোফাইল তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। এই প্রোফাইলে আয়কর রিটার্নের তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব, বড় অঙ্কের লেনদেন, ক্রেডিট কার্ড, সম্পত্তি কেনাবেচা, গাড়ির মালিকানা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় এবং ভাড়া থেকে পাওয়া আয়ের মতো তথ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি বছরে ১২ লাখ টাকা আয় দেখালেন। কিন্তু একই সময়ে তাঁর ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা রয়েছে, তিনি ৫০ লাখ টাকার গাড়ি কিনেছেন এবং ১ কোটি টাকার জমি কিনেছেন। পাশাপাশি নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণও করছেন। তখন ঘোষিত আয় ও বাস্তব আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যে বড় পার্থক্য রয়েছে, সেটিই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে এ ধরনের অসঙ্গতি বের করতে কর কর্মকর্তাদের আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ ও নথি যাচাই করতে হয়। বিপুলসংখ্যক করদাতার কারণে সব ক্ষেত্রে একই মাত্রায় যাচাই করা সম্ভব হয় না।
নতুন পদ্ধতিতে প্রথম ধাপের কাজটি করবে প্রযুক্তি। বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক লেনদেন, সম্পদ ও জীবনযাত্রার ধরন শনাক্ত করা হবে। এরপর কর্মকর্তারা অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকিতে থাকা করদাতাদের ওপর গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করবেন। এভাবেই ঝুঁকিভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তিদেরও খুঁজবে এনবিআর
কর আদায়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকলেও অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। আবার অনেকে টিআইএন নিলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন না। কেউ রিটার্ন জমা দিলেও কর দেন না, আবার অনেকে নিয়মিত কর ও রিটার্ন দুটিই দেন।
এনবিআর এই ভিন্ন ধরনের করদাতাদের আলাদা শ্রেণিতে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে সক্রিয় করদাতাদের একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করা হবে।
নতুন ব্যবস্থায় শুধু করদাতাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার ওপর নির্ভর করা হবে না। বরং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য করদাতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
অর্থাৎ কারও আয়, সম্পদ, ব্যবসা বা ব্যয়ের ধরন যদি করদাতা হিসেবে তাঁর নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে, তাহলে সেই তথ্য থেকেই তাঁকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া যাবে।
এবার করপোরেট প্রতিষ্ঠানেও তথ্যের হিসাব
বড় কোম্পানির কর ফাঁকি শনাক্ত করতেও তথ্যের মধ্যে তুলনা করার কৌশল ব্যবহার করতে চায় এনবিআর।
একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী বিক্রয় ও মুনাফা কত, সেটি দেখার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি কত কাঁচামাল ব্যবহার করছে, কী পরিমাণ উৎপাদন করছে, বাজারে তার অংশ কত এবং সেই অনুপাতে কত কর ও ভ্যাট দিচ্ছে, এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা হবে।
এ ক্ষেত্রে কোম্পানির মোট বিক্রয় ও ঘোষিত মুনাফা, মোট মুনাফার হার, সুদ ব্যয়, ব্যবস্থাপনা ফি, রয়্যালটি, কমিশন, অবচয়, মন্দঋণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন এবং পরিচালকদের সম্মানীর মতো বিভিন্ন আর্থিক সূচক বিশ্লেষণ করা হবে।
এর পাশাপাশি আমদানি করা কাঁচামাল, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত উপকরণ, উৎপাদন এবং বিক্রয়ের তথ্যের মধ্যেও তুলনা করা হবে। ভ্যাট রিটার্নে দেখানো বিক্রয় ও আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত টার্নওভারের মধ্যেও কোনো বড় পার্থক্য রয়েছে কি না, সেটি দেখা হবে।
একই খাতের কোম্পানির হিসাবও তুলনা হবে
একই ধরনের ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শিল্পভিত্তিক মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে একই খাতের দুই বা একাধিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, বিক্রয়, মুনাফা ও কর প্রদানের চিত্র তুলনা করা যাবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য অন্যদের তুলনায় অস্বাভাবিক মনে হলে সেটি বাড়তি যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে।
প্রাথমিকভাবে সিমেন্ট, সিগারেট, খাদ্য ও পানীয় এবং এমএস পণ্য, যেমন রড ও ঢেউটিনসহ কয়েকটি খাতে এই ধরনের বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
এসব খাতে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানি, স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা উপকরণ, উৎপাদন, বাজারে অংশীদারত্ব এবং রাজস্ব প্রদানের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
কাঁচামাল থেকেই উৎপাদন ও বিক্রয়ের হিসাব
ধরা যাক, একটি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্লিংকার আমদানি করেছে। সেই কাঁচামাল থেকে সম্ভাব্য কত পরিমাণ সিমেন্ট উৎপাদন হওয়ার কথা, বাজারে কত পণ্য বিক্রি হয়েছে এবং এর বিপরীতে কত রাজস্ব দেখানো হয়েছে, তথ্য মিলিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাবে।
সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কাঁচামালের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিক্রয়ের তথ্য তুলনা করা হবে। খাদ্য ও পানীয় শিল্পে বাজার অংশীদারত্ব এবং রাজস্বের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি রড, ঢেউটিন ও প্রি-ফেব্রিকেটেড পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের যাচাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে শুধু কোনো একটি রিটার্নের ওপর নির্ভর না করে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার সামগ্রিক চিত্র বোঝার সুযোগ তৈরি হবে।
একই ধরনের দুটি কোম্পানি যদি প্রায় সমপরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করে, কিন্তু তাদের বিক্রয় ও রাজস্বে বড় পার্থক্য থাকে, তাহলে সেই ব্যবধানের কারণ খতিয়ে দেখা সম্ভব হবে। আবার বাজারে বড় অংশীদারত্ব থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠানের কর প্রদানের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কম হলে সেটিও নজরে আসতে পারে।
বকেয়া রাজস্ব আদায়েও নতুন উদ্যোগ
কর ফাঁকি শনাক্তের পাশাপাশি পুরোনো বকেয়া রাজস্ব আদায়েও গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পাওনা রয়েছে।
এই অর্থ আদায়ে আলাদা আয়কর তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কাস্টমসের আওতায় থাকা অখালাসকৃত ও বাজেয়াপ্ত পণ্য দ্রুত নিলামে তুলে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বন্ড সুবিধা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কর অব্যাহতির সুযোগ আরও যৌক্তিক করার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৭ হাজার ১৬০ কোটি টাকার কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনাটি শুধু নতুন করদাতা খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। করের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা, বর্তমান করদাতার প্রকৃত আয় ও ব্যবসার সঙ্গে কর প্রদানের সামঞ্জস্য যাচাই এবং বকেয়া ও ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব আদায়, তিন ক্ষেত্রেই একযোগে কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিন ধাপে এগোবে নতুন পরিকল্পনা
এনবিআরের পরিকল্পনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম তিন মাসে টিআইএন তথ্যভান্ডার পরিস্কার ও শ্রেণিবিন্যাস, বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা করদাতাদের তালিকা তৈরি এবং উচ্চঝুঁকির কোম্পানি ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ইউনিট চালু, করদাতাদের রিটার্ন দাখিলে উৎসাহ দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, যানবাহন ও কোম্পানির তথ্য একীভূত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি আয় ও সম্পদের স্বয়ংক্রিয় প্রোফাইল তৈরি এবং ইলেকট্রনিকভাবে অডিটের জন্য করদাতা বাছাইয়ের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এক থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রি-ফিল্ড রিটার্ন, দেশব্যাপী ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
আর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের তথ্যের পূর্ণাঙ্গ মিল যাচাই, সমন্বিত করদাতা হিসাব এবং তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
অডিটের জন্য করদাতা বাছাই করবে প্রযুক্তি
বর্তমানে কোন করদাতার হিসাব বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হবে, সেই সিদ্ধান্তে কর কর্মকর্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ঝুঁকির সূচক বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তির মাধ্যমে অডিটের জন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর সঙ্গে ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট ও ফেসলেস অডিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে করদাতাকে বারবার কর্মকর্তার দপ্তরে না গিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথি ও ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এতে হয়রানি ও অনিয়মের সুযোগ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় তথ্যের নির্ভুলতা ও অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উচ্চঝুঁকির তালিকায় ফেলা হলে সেটি নতুন সমস্যার কারণ হতে পারে।
সম্পদশালী ব্যক্তিদের ওপর বাড়বে নজর
উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা ও প্রদত্ত করের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও বিশেষভাবে যাচাই করতে চায় এনবিআর।
এ জন্য তাদের সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, বিনিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণ, কোম্পানির মালিকানা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলাদা প্রোফাইল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এসব তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনি কাঠামোর বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশি বাণিজ্যেও নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা
বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থপাচার ও রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত করতে বিদেশে বাংলাদেশি মিশনে কাস্টমস অ্যাটাশে নিয়োগের প্রস্তাবও রয়েছে এনবিআরের পরিকল্পনায়।
কারণ আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত মূল্য যাচাই করতে শুধু বাংলাদেশের তথ্য যথেষ্ট নয়। একই পণ্যের মূল্য রপ্তানিকারক দেশের নথিতে কত দেখানো হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে কোনো পণ্যের আমদানি মূল্য ১০০ ডলার দেখানো হলেও রপ্তানিকারক দেশের নথিতে যদি মূল্য ৬০ বা ১৫০ ডলার থাকে, তাহলে সেই পার্থক্য তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে।
বিদেশে কাস্টমস অ্যাটাশে থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ বাড়তে পারে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বড় লক্ষ্য
এনবিআরের পরিকল্পনার অন্যতম বড় লক্ষ্য দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। বর্তমানে এ হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদে আরও ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে শুধু প্রযুক্তি বা তথ্যভান্ডার তৈরি করলেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। প্রয়োজন নির্ভুল তথ্য, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময়, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল এবং করদাতার তথ্য ব্যবহারে স্পষ্ট নীতিমালা।
এনবিআর গত অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। চলতি অর্থবছরের জন্য সংস্থাটির রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
এই বড় লক্ষ্য পূরণে প্রচলিত কর আদায় ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন করদাতা শনাক্ত ও কর ফাঁকি বন্ধের ওপর জোর দিচ্ছে রাজস্ব প্রশাসন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ মনে করেন, এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তাঁর মতে, অযথা সাধারণ করদাতাদের অডিটে না এনে যারা এখনও করের আওতায় আসেননি এবং বড় করদাতাদের দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও মনে করেন, করের পরিধি বাড়াতে নতুন করদাতাদের সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ এবং তাদের কর ব্যবস্থায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
তাহলে ‘জাদুর চাবিকাঠি’ কী?
এনবিআরের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়, সেটি হলো বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে বিশ্লেষণ করা।
একজন করদাতা নিজে যে আয় ঘোষণা করছেন, তার বাইরে ব্যাংকে তাঁর লেনদেনের তথ্য রয়েছে। জমি কেনাবেচার তথ্য রয়েছে ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থায়। গাড়ির তথ্য রয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থায়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের তথ্য রয়েছে পুঁজিবাজারের ব্যবস্থায়। কোম্পানির মালিকানা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের তথ্যও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এতদিন এসব তথ্য আলাদা আলাদাভাবে থাকায় একজন করদাতার সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র একসঙ্গে দেখা কঠিন ছিল। এনবিআরের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এসব তথ্য একটি সমন্বিত প্রোফাইলে এনে ঘোষিত আয়, সম্পদ ও ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব হবে।
কোনো ব্যক্তির ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পদ ও জীবনযাত্রার বড় পার্থক্য থাকলে সেটি শনাক্ত হবে। একইভাবে কোনো কোম্পানির কাঁচামাল ব্যবহার, উৎপাদন, বিক্রয় ও কর প্রদানের মধ্যে অস্বাভাবিকতা থাকলেও তা নজরে আসতে পারে।
তবে এই ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে শুধু প্রযুক্তির ওপর নয়। তথ্য কতটা নির্ভুল, সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, করদাতার গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত এবং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক, তার ওপরও ফলাফল নির্ভর করবে।
সবকিছু ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এনবিআরের নতুন কৌশলের প্রকৃত শক্তি হতে পারে এই তথ্যের সমন্বয়। করদাতার নিজের ঘোষণার সঙ্গে বিভিন্ন উৎসের তথ্য মিলিয়ে অসঙ্গতি বের করতে পারলেই রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আর সেখানেই কর আদায় বাড়ানোর সেই বহুল আলোচিত ‘জাদুর চাবিকাঠি’ লুকিয়ে থাকতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ























