শরতে কমেছে পানি, ফুটে উঠেছে সাদাপাথরের সৌন্দর্য

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৩২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৩৯ অপরাহ্ণ

শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। পাহাড়ের গা ঘেঁষে স্বচ্ছ পানির ধারা বয়ে যাচ্ছে। কোথাও পানির নিচে পাথর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও নদীর বুক চিরে জেগে উঠেছে সাদা পাথরের বড় বড় অংশ। চারপাশে নীল আকাশ, সবুজ পাহাড় আর স্বচ্ছ পানির এই মিলন ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরকে দিয়েছে এক ভিন্ন সৌন্দর্য।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এই জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে শরৎ আসতেই পানির প্রবাহ কিছুটা কমেছে। ফলে পানির নিচে থাকা পাথরের অনেক অংশ এখন দৃশ্যমান। বর্ষার তুলনায় পানির পরিমাণ কম হলেও পর্যটকদের আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই। বরং স্বচ্ছ পানি ও পাথরের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগে অনেকের কাছে এই সময়টিই হয়ে উঠছে ঘোরাঘুরির জন্য উপযুক্ত।

নৌকায় শুরু হয় সাদাপাথর ভ্রমণ

সাদাপাথরে যেতে হলে ঘাট থেকে নৌকায় উঠতে হয়। ছোট ছোট নৌকা নিয়ে মাঝিরা পর্যটকদের এক পাশ থেকে অন্য পাশে পৌঁছে দেন। নৌকার যাত্রাপথেই চোখে পড়ে পাহাড়ের পাদদেশ, স্বচ্ছ জলধারা আর ছড়িয়ে থাকা পাথরের মনোরম দৃশ্য।

নৌকায় বসে চারপাশ দেখতে দেখতে কখন যে গন্তব্য কাছে চলে আসে, তা অনেকেরই টের পাওয়া যায় না। ঘাটে সারি করে বাঁধা থাকা নৌকাগুলোও সাদাপাথরের পর্যটন দৃশ্যেরই একটি পরিচিত অংশ।

জিরোপয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছালে বদলে যায় দৃশ্যপট। পানির স্বচ্ছতা আরও বেশি চোখে পড়ে। পানির নিচে থাকা পাথরগুলোও পরিষ্কার দেখা যায়। শরতের রোদে পানির ওপর আলো পড়ে তৈরি করে ঝিলমিল করা এক দারুণ দৃশ্য।

জিরোপয়েন্টে পানিতে আনন্দ

সাদাপাথরের জিরোপয়েন্টে পৌঁছানোর পর অনেক পর্যটক আর নৌকায় বসে থাকতে চান না। স্বচ্ছ পানিতে নেমে গোসল, পানিতে খেলাধুলা কিংবা পাথরের ওপর বসে সময় কাটানোতেই আনন্দ খুঁজে নেন তারা।

বিশেষ করে শিশুদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। পানিতে নেমে হইহুল্লোড়, একে অপরের সঙ্গে খেলাধুলা আর পাথরের ওপর বসে ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকে তারা।

পরিবার নিয়ে আসা পর্যটকদের অনেকেই একসঙ্গে পানিতে নামেন। কেউ পানির ধারে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, আবার কেউ স্বচ্ছ জলের মধ্যে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে উপভোগ করেন প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অনুভূতি।

পাথরের ওপর বসে প্রকৃতি দেখা

সাদাপাথরে শুধু পানিতে নামার আনন্দই নেই। যারা পানিতে নামতে চান না, তাদের জন্যও রয়েছে প্রকৃতি উপভোগের সুযোগ।

পাথরের ওপর বসে পাহাড়, পানি ও আকাশের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় দীর্ঘ সময়। অনেকে আবার প্রখর রোদ এড়াতে ছাতার নিচে চেয়ার নিয়ে বসেন। পড়ন্ত বিকেলে যখন রোদের তেজ কিছুটা কমে আসে, তখন জল আর পাথরের মাঝখানে বসে বিশ্রাম নিতে দেখা যায় অনেককে।

শরতের বিকেলের আলোয় চারপাশের দৃশ্য আরও কোমল হয়ে ওঠে। পাহাড়ের ছায়া পানিতে পড়ে, পাথরের গায়ে সূর্যের আলো ঝলমল করে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনশীল দৃশ্যই সাদাপাথর ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।

বর্ষার চেয়ে এখন আলাদা সাদাপাথর

বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে সাদাপাথরের অনেক অংশ পানির নিচে থাকে। তখন পানির প্রবাহও থাকে বেশি। শরৎকালে সেই পানি কমে আসায় পাথরের বড় একটি অংশ আবার দৃশ্যমান হয়েছে।

তাই একই জায়গা হলেও ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে গেছে সাদাপাথরের চেহারা। বর্ষায় যেখানে পানির স্রোত বেশি, এখন সেখানে পাথরের বিস্তৃত অংশ দেখা যাচ্ছে। স্বচ্ছ পানির কারণে নিচের পাথরগুলোও আলাদা করে চোখে পড়ে।

এই পরিবর্তিত রূপই অনেক পর্যটককে শরতের সাদাপাথরের দিকে টেনে আনছে।

পাহাড়, পানি আর পাথরের মেলবন্ধন

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় পাহাড়ের সবুজ, স্বচ্ছ পানির ধারা, সাদা পাথর আর খোলা আকাশ।

দূরে পাহাড়ের পাদদেশ, সামনে পাথর আর মাঝখানে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ। সব মিলিয়ে জায়গাটির দৃশ্য অনেকটা ছবির মতো মনে হয়। প্রকৃতিপ্রেমীদের পাশাপাশি ছবি তুলতে পছন্দ করেন এমন পর্যটকদের কাছেও তাই সাদাপাথর বেশ আকর্ষণীয়।

কখন গেলে ভালো লাগবে

সাদাপাথরের সৌন্দর্য ঋতুভেদে বদলে যায়। বর্ষায় পানির স্রোত ও পাহাড়ি ঝরনার রূপ যেমন আলাদা, তেমনি শরৎকালে স্বচ্ছ পানি ও জেগে ওঠা পাথরের দৃশ্যও কম আকর্ষণীয় নয়।

শরতের দিনে নীল আকাশ আর রোদের সঙ্গে সাদাপাথরের স্বচ্ছ পানির দৃশ্য উপভোগ করা যায়। তবে দুপুরের রোদ বেশ তীব্র হতে পারে। তাই সকালে বা বিকেলের দিকে গেলে প্রকৃতি উপভোগের পাশাপাশি রোদ থেকেও কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়।

প্রকৃতি উপভোগে চাই সচেতনতা

পর্যটকদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাদাপাথরের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও বাড়ছে। পানিতে বা পাথরের ওপর প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট কিংবা বোতল ফেলে না রেখে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা জরুরি।

কারণ এই সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ কোনো কৃত্রিম স্থাপনা নয়, প্রকৃতিই। পাহাড়, পাথর ও স্বচ্ছ পানির স্বাভাবিক পরিবেশ যতটা অক্ষত থাকবে, ততদিন সাদাপাথর তার নিজস্ব সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারবে।

শরতের আকাশে মেঘের আনাগোনা, পাহাড়ের সবুজ, পাথরের ওপর রোদের ঝিলিক আর স্বচ্ছ পানির ধারা মিলিয়ে ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর এখন যেন নতুন করে সেজেছে। পানি কিছুটা কমে গেলেও কমেনি সৌন্দর্য। বরং পাথর জেগে ওঠায় প্রকৃতির এই জনপ্রিয় ঠিকানাটি পেয়েছে একেবারেই ভিন্ন রূপ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G