ইউটিউব দেখে পেঁপে চাষ, কামালের মাসিক আয় ৪৫ হাজার টাকা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৫৪ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৫৪ অপরাহ্ণ

কুয়াকাটা-মিশ্রীপাড়া সড়কের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়বে সারি সারি পেঁপে গাছ। কোনো গাছে কাঁচা ফল, আবার কোনো গাছে ঝুলছে পাকা পেঁপে। সবুজে ঘেরা এই বাগানটি এখন পথচারী ও পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করছে। কেউ থেমে দেখছেন বাগান, আবার কেউ গাছ থেকে সদ্য পাড়া পেঁপে কিনে নিচ্ছেন।

তবে প্রায় দুই বছর আগেও জায়গাটির চিত্র এমন ছিল না। বাড়ির আঙিনার অব্যবহৃত জায়গায় শখের বশে মাত্র ৩০টি পেঁপে গাছ লাগিয়েছিলেন কুয়াকাটার লতাচাপলী ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের কৃষক মো. কামাল হোসেন। ইউটিউবে পেঁপে চাষের বিভিন্ন ভিডিও দেখে তিনি শুরু করেছিলেন এই উদ্যোগ।

সেই ছোট পরিসরের চাষ এখন পরিণত হয়েছে ১৫০টির বেশি গাছের বাগানে। আর এই বাগান থেকেই বর্তমানে মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় করছেন ৬০ বছর বয়সী কামাল হোসেন।

শখ থেকে আয়ের পথ

শুরুতে পেঁপে চাষকে ব্যবসা হিসেবে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না কামালের। বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা জায়গা কাজে লাগাতে কয়েকটি গাছ লাগিয়েছিলেন। গাছগুলো দ্রুত বেড়ে ফলন দিতে শুরু করলে তিনি চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

কামাল হোসেন বলেন, প্রথমে মাত্র ৩০টি গাছ লাগিয়েছিলেন। তখন ধারণাও ছিল না যে এই গাছগুলো একসময় পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠবে। ফলন ভালো পাওয়ার পর তিনি বাগানে ধীরে ধীরে গাছের সংখ্যা বাড়াতে থাকেন।

বর্তমানে তার বাগানে ১৫০টির বেশি পেঁপে গাছ রয়েছে। প্রতিদিনই কমবেশি পেঁপে বিক্রি হয়। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বাগান থেকেই পর্যটকরা ফল কিনে নেন। কোনো দিন বিক্রি হয় প্রায় দুই হাজার টাকার, আবার কোনো দিন তা বেড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। সব মিলিয়ে মাসিক গড় আয় দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায়।

কামালের ভাষায়, শুরুতে এটি ছিল নিছক শখের কাজ। এখন সেই শখই সংসারের খরচ মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জায়গা আরও বেশি থাকলে বাগানটি বড় করার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি।

বাগানে এসেই পেঁপে কিনছেন পর্যটকরা

কামাল হোসেনের জন্য পেঁপে বিক্রির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, উৎপাদিত ফল বাজারে নিয়ে যেতে হয় না সব সময়। রসুলপুর থেকে রাখাইন পল্লী মিশ্রীপাড়ার দিকে যাওয়ার সড়কের পাশেই তার বাগান।

কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা অনেক পর্যটক সড়ক থেকে বাগানটি দেখে গাড়ি থামান। গাছে ঝুলতে থাকা পাকা পেঁপে দেখে অনেকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই ফল কিনে নেন। ফলে পরিবহন খরচ ও বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রির ঝামেলা দুটোই কমেছে।

অন্যদিকে পর্যটকরাও বাজারের পরিবর্তে সরাসরি গাছ থেকে পাড়া তাজা পেঁপে কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।

পরিবারের সবাই এখন বাগানের কাজে

কামালের ছেলে জানান, বাবা যখন প্রথম পেঁপে গাছ লাগিয়েছিলেন, তখন পরিবারের অন্যরা বিষয়টিকে বড় কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখেননি। ইউটিউবের ভিডিও দেখে নিজের মতো করে চাষের পদ্ধতি শিখেছিলেন তিনি।

পরে গাছে ফল আসতে শুরু করে এবং নিয়মিত বিক্রি হতে থাকলে পরিবারের সদস্যদের আগ্রহও বাড়ে। এখন পেঁপে পাড়া, গাছের পরিচর্যা এবং ক্রেতাদের কাছে ফল তুলে দেওয়ার কাজে পরিবারের সদস্যরা সহযোগিতা করেন।

তার ছেলে বলেন, বাবার ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে শুরু হওয়া কাজটি এখন পরিবারের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।

তার মতে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে সব ধরনের ফসল চাষ করা কঠিন বলে অনেকের ধারণা। কিন্তু কামালের বাগান দেখে আশপাশের কৃষকরাও এখন পেঁপে চাষের পদ্ধতি, চারা ও খরচ সম্পর্কে জানতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

আশপাশের কৃষকরাও উৎসাহিত

প্রতিবেশী রহিম মুসল্লীর চোখেও কামালের উদ্যোগটি ব্যতিক্রমী। তার মতে, আগে বাড়ির আঙিনায় কয়েকটি পেঁপে গাছ দেখা গেলেও সেখান থেকে নিয়মিত আয় করার এমন উদাহরণ তারা দেখেননি।

কামালের বাগান দেখে আশপাশের অনেকেই নিজেদের খালি জায়গা কাজে লাগিয়ে পেঁপে চাষের কথা ভাবছেন। বিশেষ করে বাগানের সামনেই ক্রেতা পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে বলে জানান তিনি।

কৃষি ও পর্যটন একসঙ্গে

কামালের পেঁপে বাগান এখন শুধু কৃষিকাজের জায়গা নয়, কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্যও ছোট একটি আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

ঢাকার মহাখালী থেকে মিশ্রীপাড়া ঘুরতে যাওয়া এক দম্পতি জানান, রাস্তার পাশে পেঁপের বাগান দেখে তারা গাড়ি থামান। এরপর গাছ থেকে পেড়ে দেওয়া পেঁপে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনেছেন। বাজার থেকে ফল কেনার তুলনায় এই অভিজ্ঞতা তাদের কাছে আলাদা লেগেছে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষারের মতে, কুয়াকাটায় পর্যটকদের আগ্রহ এখন শুধু সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক নয়। স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও কৃষি নিয়েও অনেক পর্যটকের আগ্রহ রয়েছে।

তার মতে, কামালের মতো কৃষকের উদ্যোগ পর্যটন ও স্থানীয় কৃষির মধ্যে সংযোগ তৈরির সুযোগ তৈরি করছে। এতে পর্যটকরা স্থানীয় কৃষি দেখতে পারছেন এবং কৃষকরাও সরাসরি ক্রেতার কাছে নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে পারছেন।

লবণাক্ত এলাকাতেও পেঁপে চাষের সুযোগ

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা কৃষির জন্য একটি বড় সমস্যা। এ কারণে অনেক কৃষক নতুন ধরনের ফসল চাষে আগ্রহী হন না। তবে উপযুক্ত জাত নির্বাচন, মাটি ও পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিকূল পরিবেশেও বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।

তার মতে, কামাল হোসেনের পেঁপে বাগান বাড়ির আঙিনা বা অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগানোর একটি ভালো উদাহরণ। এ ধরনের উদ্যোগ অন্য কৃষকদেরও উৎসাহিত করতে পারে।

তবে উপকূলীয় এলাকায় পেঁপে চাষ বাড়ানোর আগে মাটির লবণাক্ততা, সেচের পানির মান, স্থানীয় পরিবেশ এবং রোগবালাইয়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

ইউটিউবের ভিডিও দেখে দুই বছর আগে মাত্র ৩০টি গাছ দিয়ে শুরু করা কামালের সেই উদ্যোগ এখন ১৫০টির বেশি গাছের বাগান। সড়কের পাশের এই বাগান থেকে যেমন নিয়মিত আয় হচ্ছে, তেমনি কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকদেরও টানছে। শখের সেই চাষই এখন কামালের পরিবারের বাড়তি আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য পথ হয়ে উঠেছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G