চীনের প্রাচীন খাবার থেকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, নুডলসের ইতিহাস

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৩৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৩৫ অপরাহ্ণ

দ্রুত কিছু খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু রান্নার ঝামেলায় যেতে চাইছেন না? অনেকের কাছেই তখন সহজ সমাধান নুডলস। কয়েক মিনিটের মধ্যে তৈরি করা যায় বলে বিশেষ করে ব্যস্ত মানুষ ও শিক্ষার্থীদের কাছে খাবারটি বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু প্রতিদিনের পরিচিত এই খাবারটির ইতিহাস যে প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো, তা জানলে অবাক হতে পারেন।

নুডলসের সঙ্গে চীনের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হলেও এর ইতিহাস কেবল একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে খাবারটি। বদলে যায় তৈরির পদ্ধতি, উপকরণ, আকার এবং পরিবেশনের ধরন। ফলে একই মূল খাবার থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের নুডলসজাতীয় খাবার।

তিন শিশুর মজার গল্প

নুডলস কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে নানা গল্প ও কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। শিশুদের জন্য লেখা ‘দ্য স্টোরি অব নুডলস’ নামের একটি বইয়ে তিন ভাইয়ের দুষ্টুমির গল্পের মাধ্যমে নুডলস তৈরির একটি কল্পিত কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।

গল্পে বলা হয়, রান্নাঘরে খেলতে গিয়ে তিন শিশু এমন একটি কাণ্ড ঘটিয়েছিল, যার ফলেই নাকি নুডলসের জন্ম। অবশ্য এই গল্পের সঙ্গে বাস্তব ইতিহাসের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। নুডলসের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজদরবারের রাঁধুনি, নামী শেফ কিংবা সাধারণ মানুষের নানা গল্পও প্রচলিত হয়েছে।

তবে এসব গল্পের বাইরে নুডলসের প্রাচীনত্বের পক্ষে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও রয়েছে।

মাটির নিচে মিলেছিল প্রাচীন নুডলস

২০০৫ সালে চীনের লাজিয়া প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় গবেষণার সময় মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি পাত্রের ভেতর নুডলসের মতো খাবারের অবশেষ পাওয়া যায়। গবেষকদের ধারণা, সেটি প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো।

উদ্ধার হওয়া ওই নুডলস দেখতে অনেকটা চীনের ঐতিহ্যবাহী হাতে তৈরি লামিয়ান নুডলসের মতো ছিল। এটি এখন পর্যন্ত নুডলসের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর একটি। তবে এই আবিষ্কার নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে কিছু আলোচনা ও বিতর্কও রয়েছে।

প্রাচীন চীনে শস্যের মণ্ড তৈরি করে তা লম্বা বা সরু আকারে বানিয়ে সেদ্ধ করে খাওয়ার প্রচলন ছিল বলে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন। কখনো এটি স্যুপের সঙ্গে, কখনো সবজি বা মাংসের সঙ্গে পরিবেশন করা হতো।

মার্কো পোলোর সঙ্গে নুডলসের সম্পর্ক কতটা সত্য?

নুডলসের ইতিহাসে সবচেয়ে পরিচিত গল্পগুলোর একটি জড়িয়ে আছে ভ্রমণকারী মার্কো পোলোর নামের সঙ্গে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, চীন ভ্রমণ করে তিনি নুডলসের ধারণা ইতালিতে নিয়ে যান। সেখান থেকেই নাকি পাস্তার বিস্তার ঘটে।

কিন্তু ইতিহাসবিদদের একটি অংশ এই কাহিনি মানেন না। তাঁদের মতে, মার্কো পোলোর ইতালি ফেরার আগেই সেখানে পাস্তার মতো খাবারের অস্তিত্ব ছিল। আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এ ধরনের খাবারের ধারণা ইউরোপে পৌঁছেছিল বলেও একটি মত রয়েছে।

অর্থাৎ নুডলসের ইতিহাসকে একজন ব্যক্তি বা একটি দেশের আবিষ্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের সংস্কৃতি ও রান্নার পদ্ধতির সঙ্গে এটি সময়ের সঙ্গে বদলেছে।

এক খাবার, কত রকম রূপ

চীনে নুডলসের বৈচিত্র্য দেখলে বোঝা যায়, একটি খাবার কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিতে পারে। সেখানে পাতলা, মোটা, গোল কিংবা চ্যাপটা নানা ধরনের নুডলস রয়েছে। কোনোটি হাতে টেনে তৈরি করা হয়, আবার কোনোটি ছুরি দিয়ে কেটে বানানো হয়।

উপকরণেও রয়েছে বৈচিত্র্য। গমের পাশাপাশি চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় রাইস নুডলস। আবার মুগডালের স্টার্চ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় স্বচ্ছ গ্লাস নুডলস।

চীনের বাইরে গিয়ে নুডলস আরও নানা পরিচয় পেয়েছে। জাপানে জনপ্রিয় হয়েছে উডন, সোবা ও রামেন। কোরিয়ায় রয়েছে নেংমিয়ন। ইতালির পাস্তার সঙ্গেও নুডলসের ইতিহাস ও খাদ্যসংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।

খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে সংস্কৃতিও

নুডলস শুধু পেট ভরানোর খাবার নয়, কিছু দেশে এটি বিশেষ সাংস্কৃতিক অর্থও বহন করে। চীনে জন্মদিনে লম্বা নুডলস খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। দীর্ঘ নুডলসকে সেখানে দীর্ঘ জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

তাই জন্মদিনের নুডলস খাওয়ার সময় অনেকেই চেষ্টা করেন, যেন নুডলস না ভেঙে খাওয়া যায়। খাবারের সঙ্গে এমন সাংস্কৃতিক বিশ্বাস নুডলসকে কেবল একটি সাধারণ খাবারের চেয়েও বেশি কিছুতে পরিণত করেছে।

কীভাবে তৈরি হয় নুডলস?

নুডলস তৈরির মূল পদ্ধতি বেশ সহজ। প্রথমে আটা বা অন্য কোনো শস্যের মণ্ড তৈরি করা হয়। এরপর সেটি পাতলা করে বেলে কেটে নেওয়া যায়। আবার কিছু ধরনের নুডলস হাতে টেনে লম্বা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ছাঁচ ব্যবহার করেও নানা আকৃতি দেওয়া হয়।

এরপর সেগুলো পানিতে সেদ্ধ করে বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশন করা হয়। স্যুপের সঙ্গে খাওয়া যায়, আবার সবজি, ডিম, মাংস কিংবা বিভিন্ন সস দিয়ে ভেজেও খাওয়া যায়। বাংলাদেশে ডিম বা মুরগির সঙ্গে ভাজা নুডলসের জনপ্রিয়তাও বেশ বেশি।

ইনস্ট্যান্ট নুডলস বদলে দিল খাবারের অভ্যাস

হাজার হাজার বছরের পুরোনো নুডলসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে আধুনিক যুগে। শিল্পায়নের ফলে নুডলস উৎপাদনে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। পরে বাজারে আসে এমন নুডলস, যা অল্প সময়ের মধ্যেই রান্না করা যায়।

বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের খাদ্যসংকটের সময় দ্রুত রান্না করা এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবারের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে জাপানি উদ্যোক্তা মোমোফুকু আন্দো এমন একটি নুডলস তৈরির চেষ্টা করেন, যা সহজে রান্না করা যাবে এবং সংরক্ষণও করা যাবে।

বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৯৫৮ সালে তিনি ‘চিকেন রামেন’ নামে বিশ্বের প্রথম ইনস্ট্যান্ট নুডলস বাজারে আনেন। এরপর ১৯৭১ সালে তিনি তৈরি করেন কাপ নুডলস। এতে গরম পানি দিয়ে অল্প সময়েই নুডলস তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।

এরপর ইনস্ট্যান্ট নুডলস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, ভ্রমণকারী থেকে শুরু করে ব্যস্ত পরিবারের রান্নাঘরেও এটি জায়গা করে নেয়।

পুরোনো স্বাদ এখনও অটুট

ইনস্ট্যান্ট নুডলস বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হলেও চীনের ঐতিহ্যবাহী হাতে তৈরি নুডলসের আবেদন কমেনি। দেশটির অনেক জায়গায় এখনও রাঁধুনিরা ক্রেতার সামনে হাতে মণ্ড টেনে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে লম্বা নুডলস তৈরি করেন।

হাজার হাজার বছর আগে যে খাবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলেছে বহুবার। কখনো তা ছিল সাধারণ মানুষের খাবার, কখনো স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ, আবার আধুনিক যুগে হয়ে উঠেছে কয়েক মিনিটে তৈরি করা জনপ্রিয় খাবার।

তাই রাতে পড়ার ফাঁকে কিংবা ক্ষুধা মেটাতে এক প্যাকেট নুডলস তৈরি করার সময় মনে রাখা যায়, সামনে থাকা এই সাধারণ খাবাটির পেছনে রয়েছে প্রায় চার হাজার বছরের দীর্ঘ এক ইতিহাস।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G