শাক-সবজি ও পেয়ারায় ‘অতিমাত্রায়’ ভারী ধাতু, কী বলছে গবেষণা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৪০ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৪০ অপরাহ্ণ

পেয়ারা বাংলাদেশের মানুষের বহুল খাওয়া ফলগুলোর একটি। তবে রাজশাহী বিভাগের কয়েকটি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত পেয়ারার নমুনা পরীক্ষা করে সীসা, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিকসহ কয়েকটি ভারী ধাতুর উপস্থিতি অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে একটি গবেষণায়। বসতবাড়িতে উৎপাদিত পেয়ারার তুলনায় বাণিজ্যিক খামারের পেয়ারায় এসব ধাতুর মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

তবে গবেষকেরা বলছেন, এই ফলাফল দিয়ে দেশের সব এলাকার পেয়ারার পরিস্থিতি বিচার করা যাবে না। নির্দিষ্ট কিছু এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাটি করা হয়েছে। তাই বিষয়টিকে আতঙ্কের কারণ হিসেবে না দেখে খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মাটি, পানি ও কৃষি উপকরণের দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ১০টি এলাকায় সংগৃহীত পেয়ারার নমুনা নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। ‘কম্পারেটিভ অ্যাসেসমেন্ট অব হেভি মেটাল কনটামিনেশন অ্যান্ড নন-কার্সিনোজেনিক অ্যান্ড কার্সিনোজেনিক হেলথ রিস্কস ইন গোয়াভা ফ্রম হোম গার্ডেন অ্যান্ড কমার্শিয়াল ফার্মস ইন রাজশাহী ডিভিশন’ শিরোনামের গবেষণাটি ২০২৬ সালে জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ৬০টি পেয়ারা নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

গবেষক দলের প্রধান ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার সঙ্গে ছিলেন শারমিন আশা, মো. আব্দুল হালিম, নিজাম উদ্দিন, তামিনা আক্তার, মো. শোভন আল ফুয়াদ ও লিসা খানম।

বাণিজ্যিক পেয়ারায় বেশি ভারী ধাতু

গবেষণায় রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়। নমুনাগুলোতে আর্সেনিক, সীসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার মাত্রা পরিমাপ করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত পেয়ারায় চারটি ধাতুর ঘনত্বই বসতবাড়ির পেয়ারার তুলনায় বেশি ছিল। গবেষণায় বাণিজ্যিক খামারের নমুনায় সর্বোচ্চ গড় ঘনত্ব হিসেবে আর্সেনিক ৩ দশমিক ৮৪, সীসা ২ দশমিক ০৫, ক্যাডমিয়াম ১ দশমিক ৮৮ এবং তামা ৯ দশমিক ০৪ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি পাওয়া যায়।

গবেষণার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, বাণিজ্যিক খামারের ৩০ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিক, ৭০ শতাংশে সীসা এবং ৯০ শতাংশে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে বসতবাড়ির পেয়ারার নমুনাগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ধাতুর মাত্রা অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল। তবে বসতবাড়ির ২০ শতাংশ নমুনায় ক্যাডমিয়ামের মাত্রা সীমার ওপরে পাওয়া যায়।

গবেষকদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা পেয়ারায় ভারী ধাতুর আধিক্যের পেছনে কৃষিজমির মাটি, সেচের পানি, কৃষি উপকরণসহ বিভিন্ন সম্ভাব্য উৎস ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দূষণের নির্দিষ্ট উৎস চিহ্নিত করতে মাটি, পানি ও উদ্ভিদের নমুনা নিয়ে আরও সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশের সব এলাকার পেয়ারার জন্য প্রযোজ্য নয়। নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ও উৎপাদনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

তার মতে, গবেষণার উদ্দেশ্য আতঙ্ক তৈরি করা নয়; বরং খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনা। পেয়ারা দেশে ব্যাপকভাবে খাওয়া হয় বলে এতে ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। ভবিষ্যতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এখন থেকেই দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, কৃষকদের সচেতনতা এবং নিয়মিত নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শাক-সবজিতেও মিলেছে ভারী ধাতু

শুধু পেয়ারাই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকার শাক-সবজিতেও ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ছয় জেলা থেকে নয় ধরনের সবজি সংগ্রহ করে এ বিষয়ে গবেষণা করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া।

গবেষণায় আলু, বেগুন, ঢেঁড়স, টমেটো, লাল শাক, পটল, বাঁধাকপি, শসা ও মটরশুঁটি পরীক্ষা করা হয়। এসব সবজিতে সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকার সবজিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের যেসব এলাকায় শিল্পকারখানা বেশি, সেসব এলাকার নমুনায় ভারী ধাতুর উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যায়। শিল্পকারখানার বর্জ্যের মাধ্যমে ভারী ধাতু মাটিতে প্রবেশ করলে সেখান থেকে তা কৃষিজমির উৎপাদিত ফসলেও যেতে পারে।

লাল শাকে ক্যাডমিয়াম বেশি

গবেষণায় লাল শাক, বেগুন, ঢেঁড়স ও টমেটোতে ক্যাডমিয়ামের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি কেজিতে ১৯০ মাইক্রোগ্রাম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু পরীক্ষায় লাল শাকে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ পাওয়া যায় ৭০৪ দশমিক ৩২ মাইক্রোগ্রাম।

এ ছাড়া প্রতি কেজি বেগুনে ২৭৫ দশমিক ৬৬ মাইক্রোগ্রাম, ঢেঁড়সে ৩৪৯ মাইক্রোগ্রাম এবং টমেটোতে ১৯৫ মাইক্রোগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ২০২৪ সালে করা এ গবেষণার ফলাফল নিয়ে এখন নিবন্ধ প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।

অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া বলেন, ভারী ধাতুর দূষণ কমাতে প্রথমেই এর উৎস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শিল্পবর্জ্য, অটোরিকশার ব্যাটারি, কিছু সার এবং দূষিত সেচের পানি মাটিতে ভারী ধাতু যোগ করতে পারে। দূষিত মাটি ও পানি থেকে এসব উপাদান গাছের মাধ্যমে ফসলে পৌঁছাতে পারে।

তার মতে, শুধু খাদ্য উৎপাদনের পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। দূষণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে তা কমানো যায়, সেটি নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে রান্না ও খাওয়ার পর খাদ্যে থাকা ভারী ধাতুর কতটা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, সে বিষয়েও আরও গবেষণা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যের জন্য কেন উদ্বেগের

খাবারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ভারী ধাতুর সংস্পর্শে আসা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে সীসা, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিকের মতো উপাদান দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

পেয়ারার গবেষণায়ও শুধু ধাতুর উপস্থিতি পরিমাপের পাশাপাশি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসাব করা হয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে বাণিজ্যিক খামারের পেয়ারায় অ-কার্সিনোজেনিক ও কার্সিনোজেনিক—দুই ধরনের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সূচকই বেশি ছিল। শিশুদের ক্ষেত্রে খাদ্যগ্রহণ ও শরীরের ওজনের অনুপাতের কারণে ঝুঁকির সূচক আরও বেশি হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে পেয়ারা খেলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। গবেষণাটি নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট নমুনা নিয়ে করা হয়েছে এবং গবেষকেরাও পেয়ারাকে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলেননি। বরং নিয়মিত পরীক্ষা, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ কৃষিপদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ মুশতাক হোসেন খাবারে অনুমোদিত সীমার বেশি ভারী ধাতু পাওয়া গেলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু একটি বা দুটি খাদ্যপণ্যের দিকে নজর না দিয়ে পুরো খাদ্যব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফীও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় পরিসরে কাজের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার মতে, খাদ্যে বিভিন্ন ধরনের দূষক উপস্থিতির বিষয়টি নিয়মিতভাবে পরীক্ষা ও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন নজরদারি

গবেষক সাখাওয়াত হোসেনের মতে, পেয়ারায় ভারী ধাতু পাওয়া যাওয়ার তথ্যকে আতঙ্কের কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার একটি সংকেত।

তার পরামর্শ, পেয়ারা খাওয়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, কৃষকদের সচেতন করা, নিরাপদ কৃষিপদ্ধতি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিতভাবে ফল ও সবজির নমুনা পরীক্ষা করা দরকার।

গবেষণাটিও ভবিষ্যতে মাটি, সেচের পানি ও উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে পরীক্ষা করে ভারী ধাতুর উৎস শনাক্ত করার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি ফল ও সবজিতে নিয়মিত নজরদারি এবং কৃষিতে নিরাপদ উপকরণ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের নজরদারি কতটা জরুরি

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি কৃষক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী, গবেষক ও ভোক্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে।

খাদ্যের মান পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাটি ও পানির দূষণের উৎস শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফসলের মধ্যে ভারী ধাতু ঢোকার অন্যতম সম্ভাব্য পথ হলো দূষিত মাটি ও সেচের পানি। কৃষিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ এবং শিল্পবর্জ্যও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

মাটি ও পানির দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শুধু বাজারে বিক্রির আগে ফল বা সবজি পরীক্ষা করে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা কঠিন। তাই কৃষিজমি, সেচব্যবস্থা, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য পরীক্ষাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকেরা।

সব মিলিয়ে, রাজশাহী বিভাগের পেয়ারায় ভারী ধাতুর উপস্থিতির এই গবেষণা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এটি কোনোভাবেই দেশের সব পেয়ারা বা সবজিকে অনিরাপদ প্রমাণ করে না। বরং নির্দিষ্ট অঞ্চলে পাওয়া এই ফলাফলকে ভিত্তি করে আরও বড় পরিসরে গবেষণা, দূষণের উৎস শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষা জোরদার করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G