ফ্রান্সে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে, অস্থিরতায় কাঁপছে গোটা ইউরোপ

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৯, ২০২৬ সময়ঃ ৭:১০ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৭:১০ অপরাহ্ণ

শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ক্রমেই ভয়াবহ সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে ফ্রান্সে। বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দেশটির বিভিন্ন শহরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুতর সহিংসতার মুখে পড়েছে দেশটি। একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও অর্থনৈতিক চাপ ও জনঅসন্তোষকে কেন্দ্র করে আন্দোলন জোরালো হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি শহরে দোকানপাটে লুটপাট, সড়কে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনাও। এসব ঘটনায় ফ্রান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সরকারের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের ঘটনায় দেশজুড়ে দুই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সহিংসতায় অন্তত দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব হতাহতের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

রাজপথের সহিংসতা নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে কেন পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়ে উঠল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে শিক্ষাসংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্যের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা চলছে।

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আড়ালে সহিংসতার বিস্তার

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক নেতারা। তবে বিক্ষোভের একপর্যায়ে সংঘটিত অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুর জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্দোলনের যৌক্তিক দাবি এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে।

রবিবার সন্ধ্যায় পরিস্থিতি পর্যালোচনার সময় প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি সম্পদ ধ্বংস কিংবা লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের দায় এড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও জানান তিনি।

একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো শোনার এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজতে চলতি সপ্তাহে আলোচনায় বসার আশ্বাস দেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তবে এই উদ্যোগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, আন্দোলনের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের সমাধান না হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে সংকট কাটানো কঠিন হতে পারে।

স্কুলের দাবি থেকে জাতীয় আন্দোলন

প্রতিবেদনে বর্ণিত ঘটনাক্রম অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কর্মবিরতির মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সূচনা হয়। পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সম্পদের দাবিতে তাঁরা কর্মসূচি শুরু করেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলেও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদে অংশ নিতে শুরু করেন।

এর মধ্যেই এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক ছাত্রীর ওপর নিষিদ্ধ ধরনের গলা চেপে ধরার কৌশল প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়। আন্দোলনকারীদের একটি অংশের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায় এবং প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।

ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব, আয়বৈষম্য এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ। ফলে আন্দোলন আর শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মানুষ এতে যুক্ত হওয়ায় তা বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদের রূপ নেয়।

মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্বে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, আবাসন ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

প্যারিসের একটি বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৫৭ বছর বয়সী ট্রেড ইউনিয়নকর্মী মারিয়া পাল্লস সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও বেকারত্বের চাপ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, তরুণদের সামনে কর্মসংস্থানের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেকেই প্রত্যাশিত সুযোগ পাচ্ছেন না।

এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি সরকারের প্রতি আস্থার সংকটও। মানুষের একটি অংশ মনে করছে, তাদের দৈনন্দিন দুর্ভোগ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে শিক্ষাসংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলনে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষ যুক্ত হয়েছে।

প্যারিস থেকে লিওঁ, আগুন-ভাঙচুরের ঘটনা

সপ্তাহান্তে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। দিনের কর্মসূচি অনেক জায়গায় শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাতের দিকে কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

প্যারিসে মুখোশধারী কিছু বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে। লিওঁ শহরে পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার খবরও সামনে আসে। এসব ঘটনায় শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে লিমোজেস শহরে। সেখানে প্রায় ১৪৩ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক সিটি হলের ওপরের অংশ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধসে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাটির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা অনেকের কাছে প্যারিসের নটর ডেম ক্যাথেড্রালে ২০১৯ সালে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

প্যারিস ও ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের শিকার হয়েছে বলেও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। দোকানের কাচ ভাঙা, পণ্য লুট এবং স্থাপনায় আগুন দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ দিনের বেলার প্যারিসের জমায়েতকে শান্তিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে রাতের সহিংসতা আন্দোলনের সামগ্রিক চিত্রকে জটিল করে তোলে।

ল্যুভর বন্ধ, মার্সেইয়ে সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা

রবিবার কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী প্লেস দে লা রিপাবলিক চত্বরে পুলিশের টিয়ার গ্যাস ব্যবহারের খবর পাওয়া যায়।

পরদিন সোমবার সকালে বিক্ষোভকারীরা ল্যুভর জাদুঘরের প্রবেশপথ অবরোধ করলে কর্তৃপক্ষ সেটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জাদুঘর ঘিরে এমন পরিস্থিতি পর্যটন ও নগরজীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে মার্সেই শহরে দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির কথা বলা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন বিভিন্ন শহরে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে।

সপ্তাহান্তের পর প্যারিসের কিছু এলাকাকে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো মনে হয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক দর্শনার্থী। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট ও সড়কের দৃশ্য দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে।

মার্সেইয়ের ৫৯ বছর বয়সী বাসিন্দা ফরিদা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, নিজের পরিচিত শহরকে এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা কষ্টদায়ক। তাঁর মতে, প্রতিবাদের নামে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার ঘটনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তবে আন্দোলনের দাবিগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষের সংখ্যাও কম নয়। প্যারিসের ৫৬ বছর বয়সী বাসিন্দা পাওলা ফরমেস্তির বক্তব্য ছিল, সহিংসতার বিরোধিতা করার পাশাপাশি মানুষের অভিযোগ ও দাবিগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনা জরুরি। সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে সংঘাতের পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন

সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জ্বালানির মূল্য কমানো এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কবে নাগাদ সুফল পাওয়া যাবে কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যয়ে কতটা প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে সরকারের আশ্বাসের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এদিকে সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ভয়াবহতা আগেভাগে বুঝতে পারেনি বলে স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিলেও প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ তা গ্রহণ করেননি বলে উল্লেখ রয়েছে।

এই ঘটনা সরকার ও প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কারণ, ব্যাপক জনঅসন্তোষের মধ্যে সহিংসতা প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্য, পুলিশি প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক আলোচনার কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নির্বাচন ঘিরে বাড়তে পারে রাজনৈতিক মেরুকরণ

ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এই আন্দোলনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে আগামী বছরের বসন্তে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। সেই হিসাবে সহিংসতা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের সংকট মোকাবিলার ভূমিকা নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ডানপন্থী রাজনীতিক মারিন ল্য পেনের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের সামাজিক ক্ষোভকে উগ্র বামপন্থীরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার অধিকার সমর্থন করে আসছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুই পক্ষের বক্তব্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্পষ্ট। তবে চলমান পরিস্থিতি নির্বাচনে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আন্দোলনের প্রতি মানুষের মনোভাব, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বাড়ছে অসন্তোষ

ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে শিক্ষা, আবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের নীতি নিয়ে প্রতিবাদের খবর পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব আন্দোলনের কারণ ও ধরন এক নয়। তাই ফ্রান্সের ঘটনাগুলোর সঙ্গে অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতিকে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না।

বেলজিয়ামে শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের কথা বলা হয়েছে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ইতালির মিলানে বিক্ষোভের সময় দোকান ও সুপারমার্কেটে লুটপাট, পুলিশের দিকে পাথর নিক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জলকামান ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহারের খবর দেওয়া হয়েছে। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে পুলিশের দিকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব ঘটনা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অসন্তোষের বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরে। তবে বিভিন্ন দেশের আন্দোলন একই সূত্রে পরিচালিত হচ্ছে কিংবা ফ্রান্সের সহিংসতা সরাসরি প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও আলোচনায় ফ্রান্স

ফ্রান্সের সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও মন্তব্য এসেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিমোজেসের সিটি হলে আগুন লাগার ভিডিও প্রকাশ করে ঘটনাটিকে অভিবাসন নীতির ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জর্জিয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশে ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্যের সঠিক ভাষ্য ও প্রেক্ষাপট মূল সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে না পারলে জনঅসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও অর্থনৈতিক চাপ ও জনজীবনের সমস্যা নিয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। তবে পুরো ইউরোপে একই ধরনের সংকট তৈরি হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরিস্থিতি, সরকারের পদক্ষেপ এবং আন্দোলনগুলোর গতিপ্রকৃতির ওপর।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G