ভেষজ চাষে বদলে গেছে ১৬ গ্রামের মানুষের জীবন
নাটোরের লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া এলাকায় ভেষজ উদ্ভিদ চাষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী অর্থনৈতিক জনপদ। একসময় যে অঞ্চলের অনেক পরিবার দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করত, সেখানে এখন ভেষজ চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবসাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। অ্যালোভেরা থেকে শুরু করে শিমুলমূল, অশ্বগন্ধা ও রোজেলাসহ নানা ধরনের ঔষধি উদ্ভিদ উৎপাদন করে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোক্তারা।
নাটোর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ও খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামজুড়ে বিস্তৃত এই ভেষজ পল্লী। স্থানীয়ভাবে এটি ‘ঔষধি গ্রাম’ নামে পরিচিত। এখানকার বিস্তীর্ণ জমিতে চাষ হয় বিভিন্ন প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ। কৃষিকাজের পাশাপাশি এসব উদ্ভিদ কেনাবেচা, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণেও যুক্ত রয়েছেন এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভেষজ পণ্যকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর এ অঞ্চলে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
মাঠজুড়ে অ্যালোভেরা, সঙ্গে নানা প্রজাতির ভেষজ
এলাকার কৃষিজমিতে চোখে পড়ে সারি সারি অ্যালোভেরা গাছ। পাশাপাশি চাষ হচ্ছে শতমূলী, ঘৃতকাঞ্চন, মিছরিদানা, আলকুশি, অশ্বগন্ধা ও রোজেলাসহ নানা ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ। শুধু কৃষিজমি নয়, অনেক বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের খালি জায়গাতেও রয়েছে এসব গাছের চাষ।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদের তালিকায় রয়েছে বাসক, তুলসী, হরিতকী, বহেরা, নিম, অর্জুন, পুদিনা, যষ্টিমধু, কেশরাজ, লজ্জাবতী, নিশিন্দা, তেলাকুচ ও ভুঁইকুমড়াসহ আরও অনেক প্রজাতি। এসব উদ্ভিদকে ঘিরে এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক ভেষজ পণ্যের দোকান। ফলে কৃষিকাজের বাইরেও ব্যবসা ও পণ্য বিপণনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১৫৫ হেক্টর জমিতে ভেষজ চাষ
নাটোর কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া এলাকায় প্রায় ১৫৫ হেক্টর জমিতে ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করা হয়। এর মধ্যে ৭৫ হেক্টর জমিতে রয়েছে অ্যালোভেরা। এ এলাকায় প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন অ্যালোভেরা উৎপাদিত হয়। শিমুলমূল চাষ করা হয় প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে। বাকি ৩০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন করা হয় বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ।
এখানকার অ্যালোভেরা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ওষুধ, প্রসাধনসামগ্রী, জুস ও শরবত তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে এর ব্যবহার রয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত একটি জুস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও স্থানীয় অ্যালোভেরার বড় ক্রেতা। এ ছাড়া পল্লীর ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি বিভিন্ন পণ্য দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আফাজ উদ্দিনের হাত ধরে ভেষজ চাষের বিস্তার
এই ভেষজ পল্লী গড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলার। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালের দিকে তিনি খোলাবাড়িয়ায় নিজের বাড়ির আশপাশে বিভিন্ন প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ চাষ শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসব গাছ সংগ্রহ করে নিজের বসতভিটায় রোপণ করতেন তিনি।
তাঁর উদ্যোগ ও আগ্রহ দেখে এলাকার অন্য বাসিন্দারাও ভেষজ চাষে উৎসাহিত হন। ধীরে ধীরে একটি বাড়ির আঙিনা থেকে এই চাষ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে। একপর্যায়ে ভেষজ উৎপাদন স্থানীয় মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।
আফাজ উদ্দিন পাগলা মারা গেলেও তাঁর শুরু করা উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন এলাকার কৃষকেরা। বর্তমানে লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামে ভেষজ উদ্ভিদ চাষের পাশাপাশি তা বিক্রি ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজও চলছে।
ভেষজ চাষে স্বাবলম্বী কৃষকেরা
স্থানীয় কৃষকদের কাছে ভেষজ চাষ এখন আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নতুন নতুন উদ্ভিদের চাহিদা তৈরি হওয়ায় অনেকেই প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি ভেষজ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
রোজেলা চাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সালে তিনি প্রথম রোজেলা চাষ শুরু করেন। চলতি বছর দুই একর জমিতে এই ফসলের আবাদ করেছেন। তাঁর চাষ দেখে এলাকার আরও অনেক কৃষক রোজেলা উৎপাদনে উৎসাহিত হয়েছেন।
অ্যালোভেরা চাষি হাফিজুল ইসলাম জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি এ উদ্ভিদ চাষ করছেন। তাঁর মতে, সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে অ্যালোভেরার ভালো ফলন পাওয়া যায়। এক বিঘা জমিতে বছরে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ থাকে বলে জানান তিনি। এলাকার অনেক কৃষকই কমবেশি অ্যালোভেরা চাষ করেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সরাসরি জমি থেকে এই উদ্ভিদ কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন।
ভেষজ চাষি রুস্তম আলী বলেন, আফাজ উদ্দিনের উদ্যোগ থেকেই এলাকায় ভেষজ চাষের প্রসার ঘটে। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে অনেক কৃষক এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। এতে বহু পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। অ্যালোভেরার পাশাপাশি বর্তমানে রোজেলা চাষেও কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
ভেষজ পণ্য বিক্রিতেও তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান
শুধু উদ্ভিদ উৎপাদন নয়, এসব কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করার মাধ্যমেও আয় করছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। লক্ষ্মীপুর বাজারের ভেষজ পণ্য ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন জানান, তাঁরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে গুঁড়া ও হালুয়াসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়। চাহিদা থাকায় নিয়মিত ব্যবসায়ীরা তাঁর দোকান থেকে পণ্য কিনতে আসেন।
তবে ভেষজ পণ্যের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে কোনো দাবি করার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও অনুমোদিত তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় বাড়তে পারে উৎপাদন
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম বলেন, লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়া এলাকার ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে ভেষজ চাষ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম জড়িত। এখানকার উৎপাদিত ঔষধি উদ্ভিদ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে অ্যালোভেরার উৎপাদন উল্লেখযোগ্য।
তিনি মনে করেন, ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে গবেষণা জোরদার করা এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে এ খাতে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে লক্ষ্মীপুর-খোলাবাড়িয়ার ভেষজ পল্লী স্থানীয় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষকদের অভিজ্ঞতা, নতুন ফসলের প্রতি আগ্রহ এবং ভেষজ পণ্যের বাজারকে কাজে লাগানো গেলে এই অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ


















