বালিশের পাশে মোবাইল নিয়ে ঘুমান? জেনে নিন শরীরে কী প্রভাব পড়ে

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৯, ২০২৬ সময়ঃ ৭:২০ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৭:২০ অপরাহ্ণ

ঘুমাতে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ফোন দেখা, আবার সকালে ঘুম ভাঙতেই সবার আগে মোবাইল হাতে নেওয়া, এমন অভ্যাস অনেকেরই। কেউ বালিশের পাশে ফোন রাখেন, কেউ রাখেন বিছানার পাশের টেবিলে। আবার অনেকে সারা রাত ফোন চার্জে দিয়ে রাখেন বিছানার কাছেই। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মোবাইল ফোন যেন রাতের বিশ্রামের সময়েও আমাদের সঙ্গ ছাড়ছে না।

তবে ঘুমের সময় ফোন কাছে রাখার বিষয়টি শুধু অভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাতে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন দেখা, বারবার নোটিফিকেশনে ঘুম ভাঙা কিংবা বিছানায় ফোন চার্জ দেওয়ার কারণে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিয়ে নানা উদ্বেগ থাকলেও শুধু বিছানার পাশে ফোন রাখার কারণে ক্যানসার বা গুরুতর রোগ হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তাহলে ঘুমের সময় ফোন কাছে রাখলে কোন বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকা প্রয়োজন? জেনে নেওয়া যাক।

১. ঘুম আসতে দেরি হতে পারে নীল আলোর কারণে

ঘুমের আগে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অন্যতম সমস্যা হলো ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত। ফোনের পর্দা থেকে নির্গত আলো, বিশেষ করে নীল আলোর সংস্পর্শ, শরীরের অভ্যন্তরীণ সময়চক্র বা সার্কাডিয়ান রিদমে প্রভাব ফেলতে পারে। এই সময়চক্র শরীরকে কখন জেগে থাকতে হবে আর কখন ঘুমের প্রস্তুতি নিতে হবে, তা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

সন্ধ্যা বা রাতে উজ্জ্বল আলোর সংস্পর্শে ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমে যেতে পারে। ‘পার্সোনাল অ্যান্ড ইউবিকুইটাস কম্পিউটিং’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাতেও সন্ধ্যার আলো এবং ঘুমের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে প্রভাব কতটা হবে, তা আলোর তীব্রতা, ব্যবহারের সময় এবং কতক্ষণ আলোতে থাকা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে।

ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোরাঘুরি, ভিডিও দেখা কিংবা বারবার বার্তা পড়ার অভ্যাসও ঘুমের সময় পিছিয়ে দিতে পারে। শুধু তা-ই নয়, আকর্ষণীয় বা উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়বস্তু দেখতে থাকলে পর্দার উজ্জ্বলতা কম থাকলেও মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকতে পারে।

যা করতে পারেন: ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন। রাতে ঘরের আলো কমিয়ে রাখুন এবং প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যান। ফোনের নাইট মোড চোখে পড়া নীল আলোর পরিমাণ কমাতে সহায়তা করতে পারে, তবে এটি দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহারের সব প্রভাব দূর করতে পারে না।

২. নোটিফিকেশনে বারবার ভাঙতে পারে ঘুম

ফোন ব্যবহার না করলেও এর শব্দ, কম্পন কিংবা পর্দায় জ্বলে ওঠা নোটিফিকেশন রাতের বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। কোনো বার্তা বা কলের কারণে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। কখনো এমনও হয়, ঘুমের মধ্যে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও সকালে তা স্পষ্টভাবে মনে থাকে না।

এ ধরনের ব্যাঘাত বারবার ঘটলে ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাব পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা কাজে অনীহার মতো সমস্যায় দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া ফোন হাতের নাগালে থাকলে রাতে ঘুম ভাঙার পরপরই বার্তা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরীক্ষা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে আবার ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হয় এবং নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখা কঠিন হয়ে ওঠে।

যা করতে পারেন: ঘুমানোর আগে ফোনে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ বা নীরব মোড চালু রাখুন। প্রয়োজন হলে জরুরি যোগাযোগের নম্বরগুলো থেকে কল আসার সুযোগ রাখতে পারেন। পাশাপাশি ফোনটি বালিশের পাশে না রেখে কিছুটা দূরে রাখুন, যাতে ঘুম ভাঙলেই সেটি হাতে নেওয়ার অভ্যাস কমে।

৩. মোবাইল ফোনের বিকিরণ কি ক্যানসারের কারণ?

বিছানার পাশে মোবাইল ফোন রাখা নিয়ে উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো এর বিকিরণ। মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা আরএফ শক্তি নির্গত হয়। এটি নন-আয়োনাইজিং তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের একটি ধরন। এক্স-রের মতো আয়োনাইজিং বিকিরণের তুলনায় এর শক্তি কম এবং এটি সরাসরি একইভাবে ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না।

তবে দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল ফোনের বিকিরণের সংস্পর্শে থাকার সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে। ক্যানসারবিষয়ক গবেষণার আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএআরসি রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রকে ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ বা গ্রুপ ২বি শ্রেণিতে রেখেছে। এর অর্থ, সম্ভাব্য ঝুঁকি পুরোপুরি নাকচ করার মতো প্রমাণ নেই। কিন্তু এই শ্রেণিবিন্যাসকে মোবাইল ফোন ক্যানসার ঘটায়, এমন নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বৃহৎ গবেষণাসহ বিভিন্ন গবেষণায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে মস্তিষ্কের টিউমারের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। এসব গবেষণার ফলাফলে বেশি সময় ফোনে কথা বলা ব্যক্তিদের মধ্যে কম ব্যবহারকারীদের তুলনায় মস্তিষ্কের টিউমারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সামগ্রিকভাবে বর্তমান প্রমাণ শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহার বা বিছানার পাশে ফোন রাখার সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেনি।

যা করতে পারেন: বিকিরণের সংস্পর্শ কমাতে চাইলে ঘুমের সময় ফোনটি শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখতে পারেন। ফোনে কথা বলার সময় স্পিকার ব্যবহার করাও একটি বিকল্প। রাতে মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রয়োজন না থাকলে এয়ারপ্লেন মোড চালু রাখা যেতে পারে। তবে ফোন দূরে রাখার সবচেয়ে বাস্তব সুবিধাগুলোর একটি হলো রাতের বেলায় অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ও নোটিফিকেশনের ব্যাঘাত কমানো।

৪. বালিশ বা কম্বলের নিচে ফোন চার্জ দেওয়া বিপজ্জনক

ঘুমের সময় ফোন ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত তাৎক্ষণিক ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া এবং আগুন লাগার আশঙ্কা। বিশেষ করে ফোন চার্জে দিয়ে বালিশ, কম্বল বা তোশকের নিচে রাখলে তাপ বের হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে যন্ত্রটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ফোনের ব্যাটারি ক্ষতিগ্রস্ত হলে, চার্জার ত্রুটিপূর্ণ হলে কিংবা চার্জ দেওয়ার তার নষ্ট থাকলে বিপদের আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে। অতিরিক্ত তাপের কারণে পোড়ার ঘটনা ঘটতে পারে, এমনকি পরিস্থিতিভেদে আগুনও লাগতে পারে।

এ কারণে ফোন ও চার্জার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। চার্জ দেওয়ার সময় যন্ত্রের চারপাশে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

যা করতে পারেন: ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য বিছানা, বালিশ বা কম্বলের পরিবর্তে শক্ত, সমতল ও খোলা জায়গা বেছে নিন। ফোনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ভালো মানের চার্জার ও তার ব্যবহার করুন। ব্যাটারি ফুলে গেলে, তার ছিঁড়ে গেলে বা যন্ত্রে দৃশ্যমান ক্ষতি থাকলে সেটি চার্জে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কখনোই বালিশ বা তোশকের নিচে ফোন রেখে চার্জ দেবেন না।

৫. রাতের স্ক্রলিং বাড়াতে পারে মানসিক চাপ

বিছানার পাশে ফোন থাকলে ঘুমানোর আগেও কাজের ইমেইল, সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা নানা ধরনের বার্তা দেখার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সব সময় তথ্যের নাগালে থাকা মানেই মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকা নয়।

রাতে উদ্বেগজনক খবর পড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করা কিংবা কাজের বার্তার দ্রুত উত্তর দেওয়ার চাপ মানসিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। ঘুমাতে যাওয়ার সময় মনকে শান্ত করার বদলে এসব বিষয় চিন্তা বাড়িয়ে দিতে পারে।

অবশ্য ফোন কাছে রাখলেই উদ্বেগ বা বিষণ্নতা তৈরি হবে, এমনটি বলা যায় না। তবে ঘুমের সময় পিছিয়ে দেওয়া, রাতের বিশ্রাম বারবার ব্যাহত করা এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যা করতে পারেন: কাজের বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। ঘুমানোর আগে ফোন থেকে বিরতি নিয়ে বই পড়া, শান্ত ধরনের অডিও শোনা কিংবা ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া-ছাড়ার মতো আরামদায়ক অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। রাতে ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা বেশি হলে সেটি বিছানা থেকে দূরে রাখুন।

ঘুমের আগে ফোন ব্যবহারে সচেতন হোন

ঘুমের সময় মোবাইল ফোন কাছে রাখলেই গুরুতর অসুস্থতা হবে, এমন ধারণার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে ফোনের আলো, নোটিফিকেশন, গভীর রাতের স্ক্রলিং এবং অসতর্কভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে ঘুম ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

তাই ফোন পুরোপুরি ব্যবহার বন্ধ করার চেয়ে রাতের ব্যবহারে কিছু নিয়ম মেনে চলাই বেশি বাস্তবসম্মত। ঘুমানোর আগে ফোন থেকে বিরতি নেওয়া, নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিরাপদ জায়গায় চার্জ দেওয়ার মতো ছোট অভ্যাস রাতের বিশ্রামকে আরও নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ রাখতে সহায়তা করতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G