গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে যেভাবে আপনিও লেখাতে পারেন আপনার নাম

প্রকাশঃ নভেম্বর ৩, ২০২৬ সময়ঃ ৯:১৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:১৫ অপরাহ্ণ

বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা মানুষ কে? সবচেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারেন কে? কিংবা এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি বার কী করা সম্ভব? এমন হাজারো অদ্ভুত ও বিস্ময়কর প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজেদের অসাধারণ দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা কিংবা ব্যতিক্রমী কাজের মাধ্যমে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। আপনিও চাইলে হতে পারেন তাঁদের একজন। তবে এর জন্য শুধু নতুন কিছু করলেই হবে না, মানতে হবে নির্দিষ্ট নিয়ম এবং জমা দিতে হবে যথাযথ প্রমাণ।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানোর পেছনে রয়েছে মজার এক ইতিহাস। একটি পাখি শিকারের সময় ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া থেকেই জন্ম হয়েছিল এই বিখ্যাত বই প্রকাশের ধারণা।

নভেম্বর মাসের এক শীতের সকাল। ১৯৫১ সাল। আয়ারল্যান্ডের ওয়েক্সফোর্ড কাউন্টিতে স্ল্যানি নদীর তীরে বন্ধুদের সঙ্গে শিকারে গিয়েছিলেন স্যার হিউ বিভার। পাখির ঝাঁক দেখে গুলি ছুড়লেও তাঁর নিশানা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পাখিটি ছিল গোল্ডেন প্লোভার।

ঘটনার পর তাঁর মনে একটি প্রশ্ন জাগে। ইউরোপে শিকারযোগ্য পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত উড়তে পারে কোনটি, গোল্ডেন প্লোভার নাকি রেড গ্রাউস?

এ নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে শুরু হয় বিতর্ক। কেউ এক পাখির পক্ষে মত দেন, আবার কেউ অন্যটির। কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকায় কেউ কাউকে বোঝাতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান ছাড়াই আড্ডা শেষ হয়।

বিভার তখন বিখ্যাত গিনেস ব্রুয়ারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বাড়ি ফিরে তাঁর মাথায় আসে একটি নতুন ধারণা। এমন একটি বই তৈরি করা যায়, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, ছোট, দ্রুত, দীর্ঘ কিংবা অদ্ভুত বিষয়গুলোর নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকবে। এতে বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের তর্কের মীমাংসা করা সহজ হবে। পাশাপাশি পাবে আড্ডায় গিনেসের পরিচিতিও বাড়বে।

এভাবেই একটি পাখি নিয়ে বিতর্ক থেকে জন্ম নেয় বিশ্বখ্যাত রেকর্ডবিষয়ক বই প্রকাশের পরিকল্পনা।

গিনেস নামটির পেছনেও রয়েছে আলাদা ইতিহাস। ১৭৫৯ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে আর্থার গিনেস নামের এক ব্যবসায়ী একটি পুরোনো ব্রুয়ারি ইজারা নেন। চুক্তির মেয়াদ ছিল অবিশ্বাস্যভাবে ৯ হাজার বছর। পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিষ্ঠানই পরিচিতি পায় গিনেস ব্রুয়ারি হিসেবে। এই কোম্পানির নাম থেকেই রেকর্ডবিষয়ক বইটির নাম রাখা হয়। তবে গিনেস বিয়ারের সঙ্গে বইটির সরাসরি সম্পর্ক মূলত নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বই প্রকাশ থেকে বিশ্বজুড়ে রেকর্ডের স্বীকৃতি

বই প্রকাশের পরিকল্পনা তৈরি হলেও সেটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল দক্ষ তথ্যসংগ্রাহক ও লেখক। গিনেসের আরেক কর্মী ক্রিস্টোফার চ্যাটাওয়ে এ সময় নরিস ম্যাকওয়ার্টার ও রস ম্যাকওয়ার্টার নামে দুই যমজ ভাইয়ের কথা জানান। লন্ডনে তাঁদের একটি তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ছিল।

১৯৫৪ সালে বই তৈরির দায়িত্ব পান এই দুই ভাই। লন্ডনের ফ্লিট স্ট্রিটের একটি ছোট কার্যালয়ে শুরু হয় তাঁদের কাজ। বিভিন্ন পুরোনো বই, বিশ্বকোষ, গবেষণাপত্র ও বিশেষজ্ঞদের মতামত সংগ্রহ করে তথ্য যাচাই করতে থাকেন তাঁরা। কয়েক মাসের পরিশ্রমে প্রস্তুত হয় প্রথম সংস্করণ।

১৯৫৫ সালের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত হয় ‘দ্য গিনেস বুক অব রেকর্ডস’। প্রথম সংস্করণে ছিল ১৯৮টি পৃষ্ঠা।

প্রকাশের পর বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ওই বছরের বড়দিনের আগেই এটি ব্রিটেনের সর্বাধিক বিক্রীত বইগুলোর শীর্ষে উঠে আসে। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রেও প্রকাশিত হয় বইটি। ধীরে ধীরে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছে এটি হয়ে ওঠে আগ্রহের বিষয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কেক, সবচেয়ে লম্বা নখ কিংবা সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কোনো কাজ করার রেকর্ড, এমন বিচিত্র সব তথ্য জানার আগ্রহই বইটির জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়।

কোন ধরনের কাজ গিনেস রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায়?

ইচ্ছা করলেই যেকোনো কাজকে বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে দাবি করা যায় না। যেমন কেউ যদি বলেন, তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছবি আঁকতে পারেন, তাহলে সেটি গিনেসের কাছে গ্রহণযোগ্য রেকর্ড হবে না। কারণ সৌন্দর্য ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। এর নির্দিষ্ট কোনো পরিমাপ নেই।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের কাছে একটি রেকর্ড গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হয়।

১. নির্দিষ্টভাবে পরিমাপযোগ্য হতে হবে

রেকর্ডের সঙ্গে অবশ্যই কোনো সংখ্যা বা পরিমাপ যুক্ত থাকতে হবে। যেমন কত মিটার দীর্ঘ, কত সেকেন্ডে সম্পন্ন, কতজন অংশ নিয়েছেন কিংবা এক মিনিটে কতবার কোনো কাজ করা হয়েছে। এসব তথ্য সহজে গণনা বা পরিমাপ করা যায়।

অন্যদিকে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে ভালো কিংবা সবচেয়ে মজার ধরনের বিষয় নির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তাই সাধারণত এমন বিষয় রেকর্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।

২. অন্য কেউ রেকর্ডটি ভাঙার সুযোগ পাবে

একটি রেকর্ড এমন হতে হবে, যা ভবিষ্যতে অন্য কেউ অতিক্রম করার চেষ্টা করতে পারবেন। অর্থাৎ রেকর্ডটি হতে হবে প্রতিযোগিতার উপযোগী। শুধু একবার ঘটে যাওয়া কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা সাধারণত এই শর্ত পূরণ করে না।

৩. সবার জন্য একই নিয়ম থাকতে হবে

একই রেকর্ডে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য অভিন্ন নিয়ম থাকা জরুরি। ধরুন, কেউ এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি ডিগবাজি দেওয়ার রেকর্ড করতে চান। সে ক্ষেত্রে ডিগবাজি কীভাবে দিতে হবে, প্রতিবার শরীরের কোন অংশ মাটিতে লাগবে এবং কোন অবস্থায় একটি ডিগবাজি গণনা করা হবে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকতে হবে।

এ জন্য প্রতিটি রেকর্ডের ক্ষেত্রে গিনেস কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করে। অংশগ্রহণকারীদের সেই নিয়ম মেনেই চেষ্টা করতে হয়।

৪. কাজের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে

শুধু দাবি করলেই কোনো রেকর্ডের স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। রেকর্ডের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ছবি, ভিডিও, সাক্ষীদের বক্তব্য, পরিমাপের হিসাবসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয়।

৫. একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে রেকর্ড হতে হবে

রেকর্ডের মাপকাঠি স্পষ্ট হওয়া জরুরি। যেমন সবচেয়ে কম সময়ে কোনো কাজ সম্পন্ন করা অথবা নির্দিষ্ট সময়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করা। একই রেকর্ডে একাধিক বিষয় যুক্ত করলে তুলনা ও যাচাইয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

পুরোনো রেকর্ড ভাঙবেন, নাকি নতুন রেকর্ড তৈরি করবেন?

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানোর জন্য মূলত দুটি সুযোগ রয়েছে। প্রথমটি হলো আগে থেকে থাকা কোনো রেকর্ড ভাঙা। দ্বিতীয়টি হলো সম্পূর্ণ নতুন একটি রেকর্ডের প্রস্তাব দেওয়া।

গিনেসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বিভিন্ন বিষয়ের হাজার হাজার রেকর্ডের তথ্য রয়েছে। সেখানে নিজের আগ্রহের বিষয় খুঁজে বর্তমান রেকর্ডধারীর অর্জন ও রেকর্ডের নিয়ম জেনে নেওয়া যায়।

যেমন এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি সিট-আপ, সবচেয়ে লম্বা কেক তৈরি কিংবা সবচেয়ে বেশি মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে গান গাওয়ার মতো বিভিন্ন রেকর্ড রয়েছে। এসবের যেকোনো একটি বেছে নিয়ে নির্ধারিত নিয়ম মেনে বর্তমান রেকর্ড অতিক্রম করার চেষ্টা করা যায়।

অন্যদিকে, আগে কখনো করা হয়নি এমন কোনো কাজের মাধ্যমেও নতুন রেকর্ডের প্রস্তাব দেওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে গিনেস কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে হবে, আপনি কোন বিষয়ে নতুন রেকর্ডের বিভাগ তৈরি করতে চান।

প্রস্তাবটি যাচাই করে গিনেস দেখবে, সেটি তাদের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে কি না। গ্রহণযোগ্য হলে তারা নতুন রেকর্ডের নাম ও নিয়ম নির্ধারণ করে দেবে। এরপর নির্ধারিত নিয়মে প্রথমবার রেকর্ডটি গড়তে পারলে আপনিই হবেন ওই বিভাগের প্রথম রেকর্ডধারী।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে আবেদন করবেন যেভাবে

নিজের দক্ষতা বা ব্যতিক্রমী কোনো কাজের স্বীকৃতি পেতে চাইলে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।

ধাপ ১: পছন্দের রেকর্ড খুঁজে বের করুন

প্রথমে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। ওয়েবসাইটের ঠিকানা guinnessworldrecords.com। সেখানে সার্চ অপশনে নিজের পছন্দের বিষয় লিখে খুঁজুন।

যে রেকর্ডটি ভাঙতে চান, সেটির বর্তমান রেকর্ডধারীর অর্জন, প্রয়োজনীয় শর্ত এবং অংশগ্রহণের নিয়ম ভালোভাবে পড়ে নিন। নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যও এটি জরুরি।

ধাপ ২: ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলে আবেদন করুন

পছন্দের রেকর্ডটি নির্ধারণ করার পর ওয়েবসাইটে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। এরপর পুরোনো রেকর্ড ভাঙার আবেদন অথবা নতুন রেকর্ডের প্রস্তাব জমা দেওয়ার বিকল্প বেছে নিতে হবে।

আবেদন ফরমে নিজের নাম, বয়স, ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি কোন রেকর্ডটি ভাঙতে চান অথবা নতুন রেকর্ডের ধারণা কী, সেটিও বিস্তারিত জানাতে হবে।

এ ছাড়া কোথায় এবং কখন রেকর্ড গড়ার চেষ্টা করবেন, আপনার লক্ষ্যমাত্রা কত, এসব তথ্যও উল্লেখ করতে হবে।

আবেদনকারীর বয়সের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু রেকর্ডের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের বয়সসংক্রান্ত নিয়ম দেখে নেওয়া উচিত।

ধাপ ৩: আবেদনের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করুন

আবেদন জমা দেওয়ার পর গিনেসের সংশ্লিষ্ট দল সেটি যাচাই করবে। প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য কি না, তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

সাধারণ আবেদন বিনা মূল্যে করার সুযোগ রয়েছে। তবে আবেদন যাচাই করে উত্তর পেতে বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহও লেগে যায়।

যাঁরা দ্রুত উত্তর পেতে চান, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক আবেদন পর্যালোচনার সুবিধাও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তর পাওয়ার সুযোগ থাকে।

গিনেস কর্তৃপক্ষ আবেদন গ্রহণ করতে পারে, প্রত্যাখ্যান করতে পারে কিংবা প্রস্তাবিত রেকর্ডের ধরন পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারে। আবেদন অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের বিস্তারিত নির্দেশিকা পাঠানো হয়।

ধাপ ৪: নিয়ম মেনে অনুশীলন ও সাক্ষীর ব্যবস্থা করুন

আবেদন অনুমোদনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া। রেকর্ডের ধরন অনুযায়ী দীর্ঘদিন অনুশীলনের প্রয়োজন হতে পারে।

এ সময় রেকর্ডের নির্দেশিকায় দেওয়া প্রতিটি শর্ত মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি রেকর্ড গড়ার চেষ্টার সময় উপস্থিত থাকার জন্য স্বাধীন সাক্ষীর ব্যবস্থা করতে হবে।

গিনেসের সাধারণ নির্দেশনায় অন্তত দুজন স্বাধীন সাক্ষীর কথা বলা হয়। স্বাধীন সাক্ষী বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যাঁর সঙ্গে আবেদনকারীর পারিবারিক সম্পর্ক বা রেকর্ডের ফলাফলের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত নেই।

যেমন স্কুলের শিক্ষক, প্রশিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তি সাক্ষী হতে পারেন।

সাক্ষীদের দায়িত্ব হলো পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা, নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা দেখা এবং ফলাফলের সত্যতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা।

ধাপ ৫: ছবি ও ভিডিওসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ করুন

গিনেসে রেকর্ডের স্বীকৃতি পেতে প্রমাণ জমা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রেকর্ড গড়ার পুরো প্রক্রিয়া ভিডিওতে ধারণ করতে হবে।

ভিডিওতে যেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনাটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গণনা, সময় পরিমাপ এবং রেকর্ডের ফলাফল যাচাই করা যায়, এমনভাবে ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

প্রমাণ হিসেবে জমা দেওয়া ভিডিওতে কোনো ধরনের সম্পাদনা বা কাটাছেঁড়া করা যাবে না, যা ঘটনার ধারাবাহিকতা কিংবা সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে। প্রয়োজন অনুযায়ী ছবি, সাক্ষীদের বিবৃতি ও পরিমাপের নথিও সংগ্রহ করতে হবে।

বড় পরিসরের আয়োজনের ক্ষেত্রে গিনেসের অফিশিয়াল বিচারক সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেন। তবে এ ধরনের আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ও খরচ থাকতে পারে। বিচারক উপস্থিত রাখার ব্যয় সাধারণত আয়োজককেই বহন করতে হয়।

ধাপ ৬: প্রমাণ জমা দিয়ে স্বীকৃতির অপেক্ষা করুন

রেকর্ডের চেষ্টা সম্পন্ন হলে ভিডিও, ছবি, সাক্ষীদের বিবৃতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি গিনেসের ওয়েবসাইটে জমা দিতে হবে।

এরপর রেকর্ড ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরা সব তথ্য যাচাই করবেন। ভিডিওর সঙ্গে জমা দেওয়া হিসাব মিলিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি সাক্ষীদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণও পরীক্ষা করা হবে।

প্রয়োজনে অতিরিক্ত তথ্য বা নথি চাওয়া হতে পারে। প্রমাণ অসম্পূর্ণ থাকলে স্বীকৃতি পেতে দেরি হতে পারে।

সবকিছু ঠিক থাকলে গিনেস কর্তৃপক্ষ রেকর্ডের স্বীকৃতি দেবে। অনুমোদনের পর ডিজিটাল সার্টিফিকেট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কাগজের সার্টিফিকেট বা বিশেষ স্মারক সংগ্রহ করতে চাইলে আলাদা খরচ হতে পারে।

তবে রেকর্ড অনুমোদন না পেলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। প্রমাণের ঘাটতি, ভিডিও ধারণের সমস্যা, সাক্ষীর তথ্য কিংবা গণনায় ভুলের কারণে আবেদন বাতিল হতে পারে। এসব সমস্যা সংশোধন করে প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে আবারও চেষ্টা করা সম্ভব।

মনে রাখতে হবে, আবেদন, যাচাই, ফি ও সার্টিফিকেটসংক্রান্ত নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে গিনেসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া জরুরি।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের আয়ের উৎস কী?

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস শুধু একটি বই প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।

শুরুর দিকে গিনেস ব্রুয়ারির উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে নিজেদের পরিচিতি বাড়ানো। পাবে বসে মানুষের বিভিন্ন বিতর্কের সমাধান দিতে বই প্রকাশের পরিকল্পনা করা হলেও এর মাধ্যমে গিনেস বিয়ারের নামও ছড়িয়ে পড়ে। বইটিতে সরাসরি বিজ্ঞাপন না থাকলেও এটি ছিল ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরির একটি কার্যকর উপায়।

বর্তমানে বই প্রকাশ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস আয় করে।

প্রতিবছর বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় বইটি প্রকাশিত হওয়ায় এর পাঠকসংখ্যাও বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, গিনেস বুক অব রেকর্ডসের বিক্রি ১৫ কোটি কপি ছাড়িয়েছে। কপিরাইটযুক্ত বইয়ের মধ্যে এটি বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রীত বইগুলোর একটি।

এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে রেকর্ড নিয়ে টেলিভিশন অনুষ্ঠান তৈরি হয়। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রেকর্ডের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এসব মাধ্যম থেকেও প্রতিষ্ঠানের আয় আসে।

বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের পরিচিতি বাড়াতে গিনেস রেকর্ড গড়ার উদ্যোগ নেয়। এ ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে গিনেস পরামর্শ, নিয়ম নির্ধারণ এবং বিচারক সরবরাহের মতো সেবা দেয়। এসব সেবার জন্য নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়। পাশাপাশি সার্টিফিকেট ও স্মারক বিক্রি এবং বিভিন্ন প্রদর্শনীর মাধ্যমেও আয় করে প্রতিষ্ঠানটি।

গিনেস ব্রুয়ারির সঙ্গে বইটির সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর কয়েকবার এর মালিকানা পরিবর্তিত হয়েছে। ২০০৮ সালে কানাডার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান জিম প্যাটিসন গ্রুপ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অধিগ্রহণ করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বইটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’। বর্তমানে এটি শুধু বই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে রেকর্ডের স্বীকৃতি দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

রেকর্ড গড়লে কী পাওয়া যায়?

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম ওঠানো অনেকের কাছেই স্বপ্নের মতো। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের অনুশীলন, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম।

কোনো একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিয়মিত চেষ্টা করলে নিজের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়ে। এই অভিজ্ঞতা পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।

বিশ্ব রেকর্ডের স্বীকৃতি পাওয়ার পর অনেকেই সংবাদমাধ্যমের নজরে আসেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। কারও কারও জন্য এই পরিচিতি ভবিষ্যতে নতুন কাজের ক্ষেত্র কিংবা পেশাগত সম্ভাবনা তৈরি করে।

তবে শুধু পরিচিতি বা সার্টিফিকেটই রেকর্ড গড়ার একমাত্র প্রাপ্তি নয়। নিজের সামর্থ্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা এবং একটি কঠিন লক্ষ্য পূরণের আনন্দও কম নয়।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ইতিহাস প্রমাণ করে, মানুষের কৌতূহল ও সৃজনশীলতার কোনো সীমা নেই। নতুন কিছু করার ইচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা এবং অধ্যবসায় থাকলে ব্যতিক্রমী অর্জনের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে নিজের পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব। সেই অর্জনের সঙ্গে দেশের নামও ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা বিশ্বে।

প্রতিবছর নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ডে। ২০২৬ সালে দিনটি পড়েছে ১২ নভেম্বর। এ দিনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের রেকর্ড গড়ার আয়োজন করা হয়।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

November 2026
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
20G