দীর্ঘ এক মাসের গ্যাস-সংকটে বিপাকে ৬৬০ বস্ত্রকল, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন

প্রকাশঃ আগস্ট ২৮, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৪৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৪৬ অপরাহ্ণ

গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুরে অবস্থিত মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলে সুতা তৈরির পাঁচটি ইউনিট রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ টন সুতা উৎপাদন করা হয়। কিন্তু এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা গ্যাস-সংকটে উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত জেনারেটরের সাহায্যে সীমিত পরিসরে কারখানা চালু রাখতে হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন জানান, গত দুই দিন ধরে গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়ে ৩ থেকে ৪ পিএসআই হয়েছে। তবে এতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। দীর্ঘ সময় কম উৎপাদনের কারণে গত এক মাসে তাঁদের প্রায় ৫ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধেও চাপ তৈরি হয়েছে।

শুধু মোশাররফ কম্পোজিট নয়, গ্যাসের সংকটে দেশের আরও শত শত বস্ত্রকল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বস্ত্রকলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের ৬৬০টি বস্ত্রকল তীব্র গ্যাস-সংকটের মধ্যে রয়েছে। এসব কারখানার অনেকগুলোতে উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে ২০১৯ সাল থেকে দেশের ২৪৪টি বস্ত্রকল বন্ধ রয়েছে।

সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক ই-মেইলে বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে বিটিএমএ। সংগঠনটি জানিয়েছে, বস্ত্রকলগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা ও যাচাইয়ের কাজ চলছে। মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পর বন্ধ বা দুর্বল হয়ে পড়া কারখানাগুলো পুনরায় সচল করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও উদ্যোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হবে।

গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বস্ত্রকলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েকটি এলাকায় গত দুই থেকে তিন দিনে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে অনেক শিল্পাঞ্চলে সংকট এখনো তীব্র। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে পারেনি এবং দীর্ঘদিনের এই সমস্যায় কারখানাগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

এলএনজি টার্মিনাল বন্ধের পর সংকট

গত ২১ জুলাই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহকারী এক্সিলারেট এনার্জির একটি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। একই সময়ে সামিটের টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।

১৫ আগস্ট এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে এবং সামিটের টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলেও শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হতে সময় লাগে। এর মধ্যেই কার্গো-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তিন দিন পর ২২ আগস্ট সেটি পুনরায় চালু হলে দেশের কয়েকটি এলাকায় শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে শুরু করে।

কোথাও রাতে চলছে কারখানা

নরসিংদী শহরের সাটিরপাড়া এলাকায় অবস্থিত ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস গ্যাসের তীব্র সংকটে টানা ২২ দিন বন্ধ ছিল। পরে গত সপ্তাহে উৎপাদন আবার শুরু হলেও দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাওয়ায় শুধু রাতে কারখানা চালানো সম্ভব হয়েছে। তবে গতকাল বিকেল থেকে সেখানে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ার কথা জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, বিকেল থেকে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। সরবরাহ নিয়মিত হলে কারখানা চালাতে বড় সমস্যা হবে না। দিনে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া গেলেও উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।

নরসিংদীর কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও নারায়ণগঞ্জে সংকট এখনো কাটেনি। ফতুল্লার বিসিক শিল্পপার্কের এমএস ডাইং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানায় ১৮ আগস্ট থেকে গ্যাস সরবরাহ নেই। এতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

কারখানাটির মহাব্যবস্থাপক বাবুল হোসেন জানান, তাঁদের দৈনিক প্রায় ১১০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা রয়েছে। প্রতি কেজি কাপড় রং করার জন্য ১০০ টাকা হিসেবে ধরলে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি পোশাক কারখানাগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কাপড় সরবরাহ করা যাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে পরবর্তী উৎপাদনেও।

গাজীপুরেও স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি

গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। শ্রীপুরের একটি বস্ত্রকলের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁদের কারখানায় গ্যাসের চাপ এখনো ২ পিএসআইয়ের নিচে। ফলে সুতা উৎপাদনের সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে।

তবে একই এলাকার এশিয়া কম্পোজিট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানা জানান, গত দুই দিন ধরে তাঁদের কারখানায় গ্যাসের চাপ ৩ থেকে ৭-৮ পিএসআই পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। এতে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে।

বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল রয়েছে। এর মধ্যে ৫২৭টি স্পিনিং মিল। তবে হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বস্ত্রকলগুলোতে গ্যাস সরবরাহ তুলনামূলক ভালো থাকায় সেখানে উৎপাদন অনেকটা স্বাভাবিক রয়েছে।

বিটিএমএর সহসভাপতি ও সংসদ সদস্য আবুল কালাম বলেন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠান চৈতি কম্পোজিটেও গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। তাঁর মতে, প্রায় এক মাস ধরে দেশের অধিকাংশ বস্ত্রকল একই ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

গ্যাস-সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ না থাকায় বস্ত্রকলগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হওয়াকে আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন তিনি।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G