একটি ছবিই বদলে দিলো ভাগ্য, ১৫ অর্ডার থেকে ফায়জার আর্টেমিস হয়ে ওঠার গল্প
চাকরির পাশাপাশি ছোট পরিসরে শুরু করেছিলেন নিজের ব্যবসা। একসময় সেই উদ্যোগই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান পরিচয়। অনলাইনে একটি নতুন নকশার শাড়ির ছবি প্রকাশের পর একদিনে ১৫টি অর্ডার পাওয়ার ঘটনা উদ্যোক্তা হিসেবে ফায়জা আহমেদ রাফার আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। কয়েক বছরের মধ্যে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি নিজের প্রতিষ্ঠান আর্টেমিসের কাজেই মন দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পড়ার সময় থেকেই নকশা ও হস্তশিল্পের প্রতি আগ্রহ ছিল ফায়জার। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি আর্ট স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনে নিজের তৈরি শাড়ি ও গয়না নিয়ে স্টল দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
২০১৬ সালে একটি গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে চরিত্র নকশাকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ফায়জা। সৃজনশীল কাজের সুযোগ থাকায় চাকরিটিও তাঁর ভালো লাগত। তবে নিজের ভাবনা ও নকশা নিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার ইচ্ছা ছিল শুরু থেকেই।
২০১৯ সালের নভেম্বরে সেই ইচ্ছাকে ব্যবসায় রূপ দেন তিনি। ইসলামপুর ও মিরপুর থেকে কাপড় কিনে শুরু করেন আর্টেমিসের কার্যক্রম। নিজের চাকরির আয় থেকে জমানো ১৫ হাজার টাকা ছিল ব্যবসার প্রাথমিক মূলধন। একই সময়ে আর্টেমিসের জন্য একটি ফেসবুক পেজও চালু করেন। শুরুতে ব্লাউজ ও কুর্তা তৈরি করতেন তিনি।
শুরুর সময় নানা বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে ফায়জাকে। ব্লকের কাজ করানোর জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হতো। অল্প পরিমাণে কাজের কারণে অনেক কারিগর সময় দিতে চাইতেন না। ফলে একটি নকশার কাজ শেষ করাতেও অপেক্ষা করতে হতো।
কখনো একটি শাড়ি প্রস্তুত হয়ে হাতে আসতে সাত দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে। এই সমস্যার সমাধানে ২০২১ সালে নিজের বাসার গ্যারেজে একটি ছোট ব্লকপ্রিন্ট ইউনিট তৈরি করেন ফায়জা। সপ্তাহে দুই দিন সেখানে একজন কারিগর এসে কাজ করতেন।
তখনো চাকরি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আর্টেমিসের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছিল তাঁকে। অফিসের কাজ শেষ করে ব্যবসার কাজে সময় দিতেন। ধীরে ধীরে অর্ডার ও কাজ বাড়তে থাকায় নিজের উদ্যোগ নিয়ে আত্মবিশ্বাসও তৈরি হতে থাকে।
ফায়জার উদ্যোক্তা জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল একটি শাড়ির ঘটনা। আর্টেমিসের শুরুর দিকে কাতানের নকশা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে একটি শাড়ি তৈরি করেন তিনি। সেই শাড়ির ছবি অনলাইনে প্রকাশের পর মাত্র একদিনেই ১৫টি অর্ডার আসে। তখন তাঁর কাছে ওই শাড়িটির মাত্র একটি নমুনা ছিল।
একসঙ্গে এত অর্ডার পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুনভাবে উৎসাহিত করে। নিজের কাজের প্রতি আস্থা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে কাপড় ও তৈরি পণ্যের পরিমাণ এত বেড়ে যায় যে তাঁর বাসার একটি বড় অংশই পণ্য রাখার জায়গায় পরিণত হয়েছিল।
২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে পুরো সময় আর্টেমিসের পেছনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ফায়জা। এরপর প্রতিষ্ঠানটির কাজ আরও বিস্তৃত হয়। বর্তমানে সুতি, মসলিন, সিল্ক ও অরগাঞ্জা কাপড় নিয়ে পোশাক তৈরি করেন তিনি। এসব পোশাকে ব্লকপ্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্ট এবং সূচিকর্মের ব্যবহার করেন।
পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়ের একটি বড় অংশ সংগ্রহ করা হয় টাঙ্গাইল, ইসলামপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে। স্থানীয় কাপড় ও ঐতিহ্যবাহী নকশাকে নিজের সৃজনশীলতার সঙ্গে মিলিয়ে পণ্য তৈরির চেষ্টা করেন ফায়জা।
দীর্ঘ সময় অনলাইনকেন্দ্রিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার পর ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি। অনলাইনে ছবি দেখে পণ্য কেনার পাশাপাশি ক্রেতারা যাতে সরাসরি পোশাক দেখে ও কিনতে পারেন, সেই চিন্তা থেকেই ২০২৫ সালে কাজীপাড়ায় চালু করেন ‘আর্টেমিস স্টুডিও’।
স্টুডিওতে শুধু ক্রেতাদের জন্য পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা নয়, রয়েছে ব্লকপ্রিন্টের একটি ছোট কারখানাও। ফলে নকশা তৈরি থেকে শুরু করে পোশাকে তা প্রয়োগের কাজও নিজেদের ব্যবস্থাপনায় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মাত্র ১৫ হাজার টাকার সঞ্চয় দিয়ে চাকরির পাশাপাশি শুরু করা উদ্যোগটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। অনলাইনে একটি শাড়ির ছবি থেকে পাওয়া ১৫টি অর্ডার যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল, সেটিই ধীরে ধীরে ফায়জার উদ্যোক্তা হওয়ার পথকে আরও দৃঢ় করেছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















