ঘরে বসেই অনলাইনে জিরো রিটার্ন দাখিল করার সহজ পদ্ধতি

প্রকাশঃ আগস্ট ২৭, ২০২৬ সময়ঃ ৮:২৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:২৬ অপরাহ্ণ

২০২৬-২০২৭ করবর্ষে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা বিশেষ আদেশের মাধ্যমে ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়। পরে ২২ জুলাই থেকে নতুন করবর্ষের ই-রিটার্ন কার্যক্রম চালুর তথ্য জানায় এনবিআর।

টিআইএন থাকলেই কর দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে টিআইএনধারী ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজন হলেও তাঁর ওপর কোনো আয়কর আরোপিত নাও হতে পারে। করযোগ্য আয় না থাকলে বা নির্ধারিত করমুক্ত সীমার মধ্যে আয় থাকলে রিটার্ন দাখিল করেও করের পরিমাণ শূন্য হতে পারে।

প্রকৃত আয় ও প্রযোজ্য হিসাবের পর যদি কোনো কর পরিশোধ করতে না হয়, সাধারণভাবে সেটিকে ‘জিরো ট্যাক্স রিটার্ন’ বলা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে রিটার্নের প্রতিটি ঘরে শূন্য বসিয়ে দিতে হবে। আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের ক্ষেত্রে নিজের প্রকৃত তথ্যই দিতে হবে। ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিলে ভবিষ্যতে আইনি ও আর্থিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ঘরে বসে কীভাবে এই রিটার্ন দাখিল করবেন, চলুন ধাপে ধাপে দেখে নেওয়া যাক।

১. এনবিআরের ই-রিটার্ন সাইটে প্রবেশ

প্রথমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। আগে থেকেই অ্যাকাউন্ট খোলা থাকলে টিআইএন ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সরাসরি লগইন করা যাবে।

নতুন ব্যবহারকারী হলে আগে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন হবে ১২ সংখ্যার টিআইএন, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং এনআইডির সঙ্গে বায়োমেট্রিকভাবে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর।

নিবন্ধন সফল হলে পরবর্তী সময়ে টিআইএন ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ই-রিটার্ন অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যাবে।

২. রিটার্ন সাবমিশনে প্রবেশ করুন

লগইন করার পর ‘রিটার্ন সাবমিশন’ অপশনে যেতে হবে। সেখানে করবর্ষ ও অ্যাসেসমেন্ট-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার ধাপ আসবে।

এরপর আয়ের বিভিন্ন খাতের তথ্য পূরণ করতে হবে। পুরো কাজ একবারে শেষ করা বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজন হলে তথ্য ধাপে ধাপে পূরণ করে সংরক্ষণ করে পরে আবার কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়।

৩. আয় না থাকলেও সব তথ্য শূন্য দেবেন না

ই-রিটার্ন পূরণের সময় সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে এই জায়গায়। আয় নেই বা কর দিতে হচ্ছে না বলে প্রতিটি ঘরে শূন্য বসিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।

আপনার প্রকৃত আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য দিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে, আপনার ব্যাংক হিসাবে টাকা থাকলে সেটি শূন্য দেখানো যাবে না। একইভাবে জমি, বাড়ি, গাড়ি, সঞ্চয় বা অন্য কোনো সম্পদ থাকলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী তার তথ্য দিতে হবে।

অর্থাৎ ‘জিরো ট্যাক্স’ বলতে বোঝায় করের পরিমাণ শূন্য, ব্যক্তির সব আর্থিক তথ্য শূন্য নয়।

৪. করমুক্ত আয়সীমা জেনে নিন

২০২৬-২০২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তি করদাতার জন্য প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত রাখা হয়েছে।

নারী করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতার ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতার জন্য এই সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

এ ছাড়া গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে সন্তান বা পোষ্যের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমার সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকার সুবিধা রয়েছে। বাবা-মা দুজনই করদাতা হলে এ সুবিধা একজন নিতে পারবেন।

তবে আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেই রিটার্নে সবকিছু শূন্য দেখানো যাবে না। করমুক্ত আয় হলেও প্রকৃত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী রিটার্ন পূরণ করতে হবে।

৫. ট্যাক্স ও পেমেন্টের হিসাব দেখুন

রিটার্নের প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করার পর ‘ট্যাক্স অ্যান্ড পেমেন্ট’ অংশে করের হিসাব দেখা যাবে।

প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে যদি প্রদেয় কর শূন্য আসে, তাহলে সেটিই জিরো ট্যাক্স রিটার্নের পরিস্থিতি।

তবে কোনো ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ বা অন্য উৎস থেকে উৎসে কর কেটে রাখা হয়ে থাকলে সেটির তথ্যও সঠিকভাবে দিতে হবে। একইভাবে আগে অগ্রিম কর পরিশোধ করা হয়ে থাকলে সেটিও সংশ্লিষ্ট অংশে উল্লেখ করতে হবে।

৬. সাবমিটের আগে পুরো রিটার্ন যাচাই

রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে ‘রিটার্ন ভিউ’ থেকে পুরো ফরমটি একবার দেখে নেওয়া উচিত।

এ সময় নিজের নাম, টিআইএন, আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায়, উৎসে কর এবং চূড়ান্ত করের হিসাব মিলিয়ে দেখতে হবে।

কোনো তথ্য ভুল থাকলে সাবমিট করার আগেই সেটি সংশোধন করে নিতে হবে।

৭. রিটার্ন জমা দিয়ে নথি সংরক্ষণ

সব তথ্য ঠিক থাকলে অনলাইনে রিটার্ন সাবমিট করা যাবে। রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন হওয়ার পর সিস্টেম থেকে অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ পাওয়া যাবে।

এ ছাড়া ট্যাক্স সার্টিফিকেটও তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে ই-রিটার্নের ট্যাক্স রেকর্ড অংশ থেকে প্রয়োজনীয় নথি দেখা, সংরক্ষণ কিংবা প্রিন্ট করা যাবে।

তাই রিটার্ন দাখিলের পর অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ ও ট্যাক্স সার্টিফিকেট নিরাপদে সংরক্ষণ করা ভালো।

২০২৬-২০২৭ করবর্ষে কর প্রণোদনার সুযোগ

২০২৬ সালের ২ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর প্রণোদনার সুযোগ রয়েছে।

তবে জিরো ট্যাক্স রিটার্নের ক্ষেত্রে এই সুবিধা কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা ব্যক্তির করযোগ্য আয় ও প্রদেয় করের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তাই জিরো ট্যাক্স রিটার্ন করলেই ৫ শতাংশ অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

মনে রাখবেন

জিরো ট্যাক্স রিটার্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক তথ্য দেওয়া। করের পরিমাণ শূন্য হতে পারে, কিন্তু আপনার প্রকৃত আয়, সম্পদ, দায় বা ব্যয়ের তথ্য শূন্য নয়।

তাই ই-রিটার্ন পূরণের সময় কোনো তথ্য গোপন করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রকৃত তথ্য দিয়ে রিটার্ন সম্পন্ন করার পর করের হিসাব শূন্য এলে সেটিই হবে সঠিকভাবে দাখিল করা জিরো ট্যাক্স রিটার্ন।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G