প্রাণীরা কি একে অপরকে নাম ধরে ডাকে, কী বলছে বিজ্ঞান?

প্রকাশঃ আগস্ট ২৮, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৪৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৪৮ অপরাহ্ণ

মানুষের পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নাম। শুধু মানুষই নয়, আমরা আমাদের পোষা প্রাণীদেরও আলাদা নাম দিয়ে থাকি। কিন্তু নাম ধরে ডেকে কাউকে শনাক্ত করার এই পদ্ধতি কি শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি প্রাণীরাও নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট নাম বা নামের মতো কোনো ডাক ব্যবহার করে?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী দলের অন্য সদস্যদের আলাদা করে শনাক্ত করতে বিশেষ ধরনের শব্দ বা ডাক ব্যবহার করে। তবে এসব ডাককে মানুষের নামের সঙ্গে পুরোপুরি তুলনা করা যায় কি না, তা নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

ডলফিনের আলাদা ‘পরিচয়বাহী’ শিস

প্রাণীদের নাম ব্যবহারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণ পাওয়া গেছে ডলফিনের ক্ষেত্রে। ১৯৬০-এর দশকে ডলফিন নিয়ে গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, বটলনোজ ডলফিনের প্রত্যেকটির নিজস্ব একটি বিশেষ শিস রয়েছে। এই শব্দকে বিজ্ঞানীরা ‘সিগনেচার হুইসেল’ নামে অভিহিত করেছেন।

এই শিসের ভূমিকা বোঝার জন্য গবেষকেরা পানির নিচে স্পিকার ব্যবহার করে বিভিন্ন ডলফিনের বিশেষ শিস বাজান। পরীক্ষায় দেখা যায়, একটি ডলফিনের নির্দিষ্ট শিস বাজালে অন্য ডলফিন সেই একই ধরনের শিস দিয়ে সাড়া দিতে পারে।

ফ্লোরিডার ডলফিন রিসার্চ সেন্টারের গবেষক কেলি জাকোলার মতে, ডলফিনের এই বিশেষ শিস তাদের পরস্পরকে শনাক্ত ও যোগাযোগ করতে সাহায্য করে। দলের সদস্যদের একে অপরকে খুঁজে পাওয়া কিংবা কোনো সমন্বিত কাজের সময়ও এই ডাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

হাতিরও কি রয়েছে আলাদা ডাক?

শুধু ডলফিন নয়, আফ্রিকান বুনো হাতিদের মধ্যেও এমন আচরণের প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা। হাতিরা মানুষের কানে খুব নিচু কম্পাঙ্কের গুমগুম শব্দের মতো যে ডাক দেয়, তার মধ্যেও নির্দিষ্ট সদস্যকে বোঝানোর বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।

গবেষক মাইকেল পার্দোর নেতৃত্বে পরিচালিত পরীক্ষায় স্পিকারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হাতির ডাক বাজানো হয়। তখন সংশ্লিষ্ট হাতিটি স্পিকারের দিকে এগিয়ে যায় এবং তুলনামূলক বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, হাতিরা নিজেদের দলের নির্দিষ্ট সদস্যকে লক্ষ্য করেও বিশেষ ধরনের ডাক ব্যবহার করতে পারে।

তোতাপাখিরাও শেখে নাম

পাখিদের মধ্যেও নামের মতো ডাক ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখা গেছে। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় পাওয়া স্পেকটেকল্ড প্যারটলেট নামের ছোট তোতাপাখিরা দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আলাদা ধরনের স্বর ব্যবহার করে।

পোষা তোতাপাখির ওপর পরিচালিত গবেষণাতেও তাদের শব্দ শেখার অসাধারণ ক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রায় ৮০০টি পোষা তোতাপাখিকে নিয়ে করা এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক পাখি মানুষের কাছ থেকে শেখা নাম ব্যবহার করতে পারে।

উত্তর কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী লরিন বেনেডিক্টের মতে, তোতাপাখিরা মানুষের কাছ থেকে অনেক শব্দ আয়ত্ত করতে পারে। শব্দের অর্থ পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও কোন পরিস্থিতিতে কোন শব্দ ব্যবহার করতে হবে, তা তারা শিখে নিতে পারে।

জরিপে অংশ নেওয়া কয়েকজন পোষা পাখির মালিক জানিয়েছেন, তাঁদের তোতাপাখি পরিবারের সদস্যদের নাম এমনকি বাড়ির পোষা কুকুরের নামও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যবহার করে। কারও নাম ভুলভাবে উচ্চারণ করলে পাখিটি সংশোধনের মতো আচরণও করেছে বলে জানিয়েছেন একজন মালিক।

তবে পোষা তোতাপাখির শেখা নাম এবং বুনো তোতাপাখির স্বাভাবিক যোগাযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বুনো তোতাপাখিরা একে অপরকে সত্যিই নামের মতো কোনো নির্দিষ্ট পরিচয়ে ডাকে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

প্রাণীর ডাককে কখন ‘নাম’ বলা যাবে?

কোনো প্রাণীর বিশেষ ডাককে মানুষের নামের সমতুল্য বলা হবে কি না, সেটি নির্ধারণ করা সহজ নয়। মারমোসেট বানরের ক্ষেত্রেও এমন বিশেষ ডাকের অস্তিত্ব লক্ষ্য করেছেন গবেষকেরা। দলের কোনো নির্দিষ্ট সদস্যকে লক্ষ্য করে তারা আলাদা শব্দ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেটিকে নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সতর্কতা রয়েছে। কারণ, ওই প্রাণী হয়তো শুধু অন্য সদস্যের স্বর অনুকরণ করছে।

গবেষকেরা প্রাণীদের কোনো ডাককে নামের কাছাকাছি হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেন। প্রথমত, ডাকটি নির্দিষ্ট একটি প্রাণীকে নির্দেশ করবে। দ্বিতীয়ত, শব্দটি শুনলে সংশ্লিষ্ট প্রাণী সম্পর্কে ধারণা তৈরি হতে হবে। তৃতীয়ত, দলের অন্য সদস্যদের কাছেও ওই ডাকের একই অর্থ থাকতে হবে।

এখন পর্যন্ত ডলফিনের ‘সিগনেচার হুইসেল’-এর ক্ষেত্রে এসব বৈশিষ্ট্যের পক্ষে তুলনামূলক শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে হাতি, তোতাপাখি কিংবা বানরের ক্ষেত্রে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

প্রাণীদের নামের মতো ডাকের প্রয়োজন কেন?

সামাজিকভাবে জটিল জীবনযাপন করা এবং বিভিন্ন ধরনের শব্দ শেখার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণীদের মধ্যে এমন যোগাযোগব্যবস্থা থাকার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে কোনো দলের সদস্যরা যখন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যায় কিংবা একে অপরের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়, তখন নির্দিষ্ট ডাকের মাধ্যমে একজনকে আরেকজনের কাছে শনাক্ত করা সুবিধাজনক হতে পারে।

এ ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা প্রাণীদের সামাজিক সম্পর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। কোনো প্রাণী নির্দিষ্ট ডাক শুনে সাড়া দিলে বোঝা যায়, সে শুধু শব্দটি শুনছে না, বরং শব্দটির সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো সদস্যের সম্পর্কও তৈরি করতে পারছে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, বেবুন, জিরাফ, কাকসহ আরও কিছু সামাজিক প্রাণীর যোগাযোগব্যবস্থাতেও হয়তো নামের মতো নির্দিষ্ট ডাকের অস্তিত্ব রয়েছে। ভবিষ্যতের গবেষণায় প্রাণীদের এই অজানা যোগাযোগজগত সম্পর্কে আরও চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G