সেশনজটের কবলে চবির ১৯ হাজার শিক্ষার্থী
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, প্রতিক্ষণ ডটকম:
চবি: বিএনপির টানা আন্দোলন ও চবির ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচির কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাড়ে চার হাজার নবীন শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থী সেশনজটের কবলে পড়ছে।
নবীনবরণ শেষ হওয়ার পর এখনো ক্লাস শুরু করতে পারেনি প্রায় সবকটি বিভাগ। এ অবস্থায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় পড়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
এদিকে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষে একজনের প্রাণহানীসহ প্রায় ১৫ জন আহত হওয়ার ঘটনায় সৃষ্ট অস্থিরতা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা সঙ্কটে ভুগছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ না হলেও কার্যত অচল হয়ে আছে। পুলিশী হয়রানি ও প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কায় বহু শিক্ষার্থী আতঙ্কে ক্লাস করতে যাচ্ছেন না।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ের বিএনপি জোটের হরতাল-অবরোধ ছাড়াও ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষের কারণে ক্যাম্পাস প্রথম মাসেই অচল হয়ে পড়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
জানা গেছে, প্রথম বর্ষে ভর্তি কার্যক্রম দেড় মাসেও সম্পন্ন না হওয়ায় নবীন শিক্ষার্থীরা শুরুতেই সেশনজটের কবলে আটকা পড়তে যাচ্ছে। ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রায় ১৫ দিনের বেশি স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এর পর শুরু হয় বিএনপি ও ছাত্রলীগের দু’পক্ষের হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি।
গত এক মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের মধ্যে অনেক বিভাগে ক্লাস পরীক্ষা সময় মতো হয়নি। এর আগে ঈদ ও অন্যান্য ছুটি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় দেড়মাস বন্ধ ছিল। ওই সময়টাতে প্রায় সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ছাত্রলীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষের কারণে গত এক মাসে অনেক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ফলে সেশনজট আরো বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান পরিস্থিতির কারণে ছয় মাসের বেশি সেশনজট ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, বিগত ২৭ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরস্পর বিরোধী সংগঠনের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ১৮টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অনেক নিরীহ ছাত্রও নিহত হয়েছেন। এছাড়া ঘটনার পর যথারীতি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। এসব কারণে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও তা অমান্য করে ক্যাম্পাসে মিছিল, মিটিং করছে ছাত্রসংগঠনগুলো। ছাত্রলীগের পরস্পর বিরোধী দু’গ্রুপ প্রকাশ্যে মিছিল-সমাবেশ করে আসছে।
এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের বগি ভিত্তিক সংগঠন সিএফসি গ্রুপের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সুমন মামুন বলেন, ‘প্রক্টরকে বাঁচাতেই প্রশাসন ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। এরপরও প্রক্টর বিরোধী আন্দোলন আমরা চালিয়ে যাবো।’
চবি শাখার ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বিকুল তাজিম বলেন, ‘আমাদের যৌক্তিক আন্দোলন ধুলিসাৎ করতেই প্রশাসন রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ঠিকই মিছিল মিটিং করছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে সদ্য ভর্তি হওয়া ইফতেকার হোসাইন বলেন, ‘অনেক আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেনো আগুনের গোলায় পা দিয়েছি।’
বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আরমান বলেন, ‘আমরা লেখাপড়া শিখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, কোনো প্রকার দলীয় রাজনীতি চর্চা করতে নয়। শিক্ষাজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে। আর এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর সিরাজ উদ দৌল্লাহ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চলছে, দেশের সার্বিক অবস্থার কারণে হয়তো শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কিছুটা কম। এর জন্য তো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। এছাড়া ছাত্রলীগের কারণে সৃষ্ট সমস্যাও বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক সংঘর্ষের ঘটনার নেপথ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও দায়িত্বরত পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করে আসছে শিক্ষকদের একাংশ ও ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ।
























