প্লাস্টিকের স্যান্ডেল কতটা নিরাপদ? ক্ষতিকর রাসায়নিকে বাড়ছে ক্যানসারের ঝুঁকি!
প্রতিদিনের চলাফেরায় অনেকেই প্লাস্টিকের স্যান্ডেল বা চটি ব্যবহার করেন। দাম তুলনামূলক কম, সহজে পাওয়া যায় এবং পানিতে ভিজলেও দ্রুত নষ্ট হয় না—এমন নানা কারণে এসব স্যান্ডেল জনপ্রিয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত প্লাস্টিকজাত পণ্যের উপাদান নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্নও রয়েছে।
বিশেষ করে নরম ও নমনীয় প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে phthalates বা ফ্যালেটস নামের একদল রাসায়নিক উল্লেখযোগ্য। এসব রাসায়নিক প্লাস্টিককে নরম ও নমনীয় করতে ব্যবহার করা হয় এবং কিছু ফ্যালেটের সঙ্গে হরমোন ও প্রজননস্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্রভাবের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে শুধু প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পরলেই ক্যানসার হবে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঝুঁকি নির্ভর করে স্যান্ডেলে কোন রাসায়নিক আছে, তার মাত্রা কত, কতক্ষণ ও কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং একজন ব্যক্তি মোট কতটা এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসছেন তার ওপর।
স্যান্ডেলের সমস্যা শুধু রাসায়নিক নয়
প্লাস্টিকের স্যান্ডেলের সম্ভাব্য সমস্যা শুধু এর রাসায়নিক উপাদানে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সস্তা ও সাধারণ ধরনের স্যান্ডেলে পর্যাপ্ত আর্চ সাপোর্ট, কুশন বা পায়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সহায়তা থাকে না।
দীর্ঘ সময় এমন স্যান্ডেল পরে হাঁটলে পায়ের ওপর চাপের বণ্টন ঠিক না-ও হতে পারে। এর ফলে গোড়ালিতে ব্যথা, পায়ের তলায় অস্বস্তি, দীর্ঘক্ষণ হাঁটার পর জ্বালাপোড়া কিংবা পায়ের বিভিন্ন অংশে ব্যথা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে যাদের দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয় বা প্রতিদিন অনেকটা হাঁটতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে আরামদায়ক ও যথাযথ সাপোর্টযুক্ত জুতা ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘাম ও আর্দ্রতা বাড়াতে পারে পায়ের সমস্যা
প্লাস্টিক বা সিনথেটিক উপাদানের কিছু স্যান্ডেলে বাতাস চলাচলের সুযোগ কম থাকে। ফলে গরমের সময় পায়ের চারপাশে ঘাম ও আর্দ্রতা জমতে পারে।
দীর্ঘ সময় পা ভেজা বা আর্দ্র অবস্থায় থাকলে ছত্রাকের সংক্রমণের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। পায়ে চুলকানি, দুর্গন্ধ, চামড়া ওঠা কিংবা লালচে হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া স্যান্ডেলের সঙ্গে পায়ের নিয়মিত ঘর্ষণের কারণে ফোসকা, চামড়া ফেটে যাওয়া কিংবা পায়ের আঙুলে ব্যথা হতে পারে।
যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে কোনো কোনো উপাদানের সংস্পর্শে ত্বকে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া দেখা দিতে পারে।
প্লাস্টিকে থাকা ফ্যালেটস কী?
ফ্যালেটস হলো এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, যা বিভিন্ন প্লাস্টিককে নরম, নমনীয় ও টেকসই করতে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে PVC বা পলিভিনাইল ক্লোরাইডভিত্তিক বিভিন্ন পণ্যে এসব রাসায়নিক ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে।
ফ্যালেটসের কয়েকটি ধরন নিয়ে স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে DEHP, DBP, DINP এবং BBzP উল্লেখযোগ্য।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে IARC তিনটি ফ্যালেট—BBzP, DBP ও DINP—নিয়ে নতুন মূল্যায়ন প্রকাশ করে। সংস্থাটি এগুলোকে মানুষের জন্য সম্ভাব্য কার্সিনোজেন বা Group 2B হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে একই মূল্যায়নে মানুষের মধ্যে ক্যানসারের প্রমাণকে পর্যাপ্ত পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, এসব রাসায়নিক নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট প্লাস্টিকের স্যান্ডেল ব্যবহার করলেই একজন মানুষের ক্যানসার হবে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে করা ঠিক নয়।
প্রজনন ও হরমোনের ওপর কেন উদ্বেগ?
কিছু ফ্যালেটকে endocrine-disrupting chemicals হিসেবে গবেষণায় দেখা হয়েছে। অর্থাৎ এগুলো শরীরের হরমোন-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে DEHP নিয়ে প্রাণী ও পরীক্ষামূলক গবেষণায় প্রজনন ও বিকাশসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রভাব দেখা গেছে। IARC-এর প্রকাশিত তথ্যেও DEHP-এর ক্ষেত্রে প্রাণীর ওপর প্রজনন ও বিকাশগত বিষক্রিয়ার প্রমাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে phthalates-এর সংস্পর্শ এবং প্রজনন ও বিকাশগত কিছু ফলাফলের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে, তবে এসব সম্পর্কের ব্যাখ্যা সব ক্ষেত্রে সরল নয়।
তাই ‘প্লাস্টিকের স্যান্ডেল প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দেয়’—এমন সরাসরি বক্তব্যের বদলে বলা বেশি সঠিক যে কিছু ফ্যালেটের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ প্রজনন ও হরমোন-সম্পর্কিত স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা?
প্লাস্টিকের স্যান্ডেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় তৈরি হয় ক্যানসারের কথা শুনে। কিন্তু এখানে রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন আলাদা।
উদাহরণ হিসেবে DEHP-এর ক্ষেত্রে IARC-এর পুরোনো মূল্যায়নে প্রাণীর পরীক্ষায় ক্যানসার হওয়ার পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে প্রমাণ অপর্যাপ্ত ছিল। সেই মূল্যায়নে DEHP-কে মানুষের জন্য ক্যানসারের বিষয়ে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের নতুন IARC মূল্যায়নে BBzP, DBP ও DINP-কে Group 2B বা ‘সম্ভবত মানুষের জন্য কার্সিনোজেনিক’ হিসেবে রাখা হয়েছে। এই শ্রেণিবিন্যাসের অর্থ হলো এসব রাসায়নিকের সম্ভাব্য ক্যানসার-ঝুঁকি নিয়ে বৈজ্ঞানিক উদ্বেগ রয়েছে; এটি ‘মানুষের ক্যানসার নিশ্চিতভাবে ঘটায়’—এমন অর্থ বহন করে না।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?
রাসায়নিকের সংস্পর্শ নিয়ে সতর্কতার বিষয়টি বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং গর্ভাবস্থার মতো সংবেদনশীল সময়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শারীরিক বিকাশ ও হরমোনের পরিবর্তনের সময় কিছু রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে।
তবে শুধু বয়স বা অবস্থার কারণে কোনো নির্দিষ্ট স্যান্ডেলকে বিপজ্জনক ঘোষণা করা যায় না। পণ্যের উপাদান, মান এবং ব্যবহারের ধরন বিবেচনা করাও জরুরি।
গরমে কি রাসায়নিকের ঝুঁকি বাড়ে?
তাপমাত্রা, ঘাম, আর্দ্রতা ও দীর্ঘ সময় ব্যবহারের মতো বিষয় প্লাস্টিকজাত পণ্য থেকে কিছু রাসায়নিক বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় ধরে গরম পরিবেশে নিম্নমানের প্লাস্টিকজাত পণ্য ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক থাকা যুক্তিযুক্ত।
তবে ‘রোদে স্যান্ডেল গললেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে ঢুকে ক্যানসার হবে’—এমন সরল দাবি করার মতো প্রমাণ নেই। মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনও পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি।
স্যান্ডেল কেনার সময় কী দেখবেন?
স্যান্ডেল কেনার সময় শুধু দাম বা বাহ্যিক ডিজাইন দেখলে হবে না। উপাদান, আরাম এবং পায়ের জন্য সঠিক সাপোর্ট আছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া উচিত।
সম্ভব হলে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের পণ্য বেছে নেওয়া ভালো। পণ্যের গায়ে উপাদানসংক্রান্ত তথ্য থাকলে সেটিও দেখা যেতে পারে।
‘Phthalate-free’ বা সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা মানের উল্লেখ থাকলে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে শুধু একটি লেবেল দেখেই কোনো পণ্যকে শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়।
দীর্ঘ সময় হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকার জন্য খুব পাতলা, শক্ত কিংবা একেবারে সাপোর্টহীন স্যান্ডেলের বদলে ভালো কুশন ও পায়ের গঠনের সঙ্গে মানানসই স্যান্ডেল ব্যবহার করা ভালো।
প্রতিদিন কীভাবে পায়ের যত্ন নেবেন?
পা সুস্থ রাখতে খুব কঠিন কোনো নিয়মের প্রয়োজন নেই। নিয়মিত পা পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকে পানি বা ঘাম জমে থাকলে তা শুকিয়ে নেওয়া উচিত।
পায়ে অতিরিক্ত ঘাম হলে বাতাস চলাচল করতে পারে এমন জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় একই স্যান্ডেল পরে থাকার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী জুতা পরিবর্তন করাও উপকারী।
স্যান্ডেল পরার পর পায়ে নিয়মিত লালচে ভাব, চুলকানি, ফোসকা, ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তাহলে কি প্লাস্টিকের স্যান্ডেল পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?
এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সব প্লাস্টিকের স্যান্ডেল একই উপাদানে তৈরি নয় এবং সব পণ্যের রাসায়নিক ঝুঁকিও এক নয়।
স্বল্প সময়ের ব্যবহারে সুবিধাজনক কিছু প্লাস্টিকের স্যান্ডেল অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। তবে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যবহারের জন্য পায়ের সঠিক সাপোর্ট, আরাম, বায়ু চলাচল এবং পণ্যের উপাদান বিবেচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে অজানা উপাদান বা নিম্নমানের পণ্য দীর্ঘ সময় ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো।
সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
প্লাস্টিকের স্যান্ডেলকে সরাসরি ‘ক্যানসারের কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেয়ে এর মধ্যে থাকা সম্ভাব্য রাসায়নিক, পণ্যের মান এবং ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে সচেতন হওয়া বেশি জরুরি।
ফ্যালেটস নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা ও মূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে। নতুন গবেষণায় কোনো রাসায়নিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। বর্তমানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু ফ্যালেট নিয়ে হরমোন, প্রজনন ও ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, কিন্তু প্লাস্টিকের স্যান্ডেল ব্যবহার করলেই ক্যানসার হবে—এমন সরাসরি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নেই।
তাই স্যান্ডেল কেনার সময় মানসম্মত পণ্য নির্বাচন, দীর্ঘ সময় ব্যবহারে আরাম ও সাপোর্টের বিষয়টি বিবেচনা এবং পায়ের কোনো অস্বাভাবিক সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে নিরাপদ পন্থা।
প্রতি / এডি / শাআ



















