এআইয়ের যুগেও যেসব তিন পেশার চাহিদা থাকবে, জানালেন বিল গেটস

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৬, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৫৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৫৫ অপরাহ্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতিতে বদলে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্রের পরিচিত চিত্র। লেখালেখি, ছবি তৈরি থেকে শুরু করে সফটওয়্যারের কোড লেখা, নানা কাজে সক্ষম হয়ে উঠছে এআই। ফলে ভবিষ্যতে মানুষের কর্মসংস্থান কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস মনে করেন, কিছু পেশায় মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

২০২৫ সালের মার্চে ভারতের মুম্বাইয়ে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আয়োজিত ‘এক্সপ্রেস আড্ডা’ অনুষ্ঠানে এআইয়ের ভবিষ্যৎ ও কর্মজগতে এর প্রভাব নিয়ে কথা বলেন বিল গেটস। সেখানে তিনি তিনটি পেশার কথা তুলে ধরেন, যেগুলোতে মানুষের ভূমিকা সহজে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে না। পেশাগুলো হলো সফটওয়্যার ডেভেলপার, জীববিজ্ঞানী ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, এসব পেশায় শুধু নিয়ম মেনে কাজ করাই যথেষ্ট নয়। নতুন ধারণা তৈরি, জটিল পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দক্ষতাও প্রয়োজন।

১. সফটওয়্যার ডেভেলপার

সফটওয়্যার ডেভেলপাররা বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার প্রোগ্রাম ও ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করেন। সফটওয়্যারের নকশা তৈরি, কোড লেখা, ত্রুটি শনাক্ত করা এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান তাঁদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এআইয়ের কারণে এই পেশায় ইতিমধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। এখন বিভিন্ন এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে দ্রুত কোড লেখা, প্রোগ্রামের ভুল শনাক্ত করা এবং নির্দিষ্ট কাজের জন্য সফটওয়্যারের অংশবিশেষ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ডেভেলপারদের কাজের গতি বাড়ছে, পাশাপাশি কিছু প্রচলিত কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে।

তবে একটি কার্যকর সফটওয়্যার তৈরি করতে শুধু কোড লিখলেই চলে না। ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বোঝা, সমস্যার উপযুক্ত সমাধান বেছে নেওয়া, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উপাদানের মধ্যে সমন্বয় করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এআই এসব কাজে সহায়তা করতে পারলেও তৈরি করা সফটওয়্যার সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা এবং জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন থাকে। এ কারণে সফটওয়্যার ডেভেলপারদের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বরং এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের কাজের ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতায় পরিবর্তন আসতে পারে।

২. জীববিজ্ঞানী

জীববিজ্ঞানীরা জীবের গঠন, বংশগত বৈশিষ্ট্য, রোগের কারণ এবং জীবদেহের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেন। নতুন ওষুধ আবিষ্কার, রোগ নির্ণয়ের উন্নত পদ্ধতি তৈরি এবং জীববিজ্ঞানের অজানা বিষয় অনুসন্ধানে তাঁদের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, ডিএনএর বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা এবং বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে সম্ভাব্য ধারণা তৈরিতে এ প্রযুক্তি সহায়তা করছে। এতে অনেক গবেষণার কাজ আগের তুলনায় দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে।

তবে গবেষণায় তথ্য বিশ্লেষণই শেষ কথা নয়। কোনো সমস্যার নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো, পরীক্ষার পরিকল্পনা তৈরি, ফলাফল যাচাই এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি থেকে নতুন ধারণা বের করার জন্য গবেষকদের বিচারবুদ্ধি ও অনুসন্ধিৎসা প্রয়োজন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো রোগের প্রকৃত কারণ অজানা থাকলে এআই আগের গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু সেই ধারণা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা এবং ফলাফলের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য নির্ধারণ করার জন্য গবেষকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

এ কারণে জীববিজ্ঞানে এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে না দেখে গবেষণার সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। নতুন আবিষ্কার ও জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে মানুষের চিন্তাশক্তি গুরুত্বপূর্ণ থাকতে পারে।

৩. জ্বালানিবিশেষজ্ঞ

বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং ভবিষ্যতের জ্বালানিব্যবস্থা পরিকল্পনায় জ্বালানিবিশেষজ্ঞদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, পারমাণবিক শক্তি ও প্রচলিত জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে তাঁদের কাজ করতে হয়।

এআইয়ের সাহায্যে বিদ্যুতের চাহিদা অনুমান, জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব বিশ্লেষণ এবং উৎপাদনব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করা সম্ভব। ফলে জ্বালানি খাতেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার বাড়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে একটি দেশের জ্বালানিব্যবস্থা পরিচালনা করা অত্যন্ত জটিল দায়িত্ব। বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় রাখা, সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা, দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত এবং মানুষের তদারকি গুরুত্বপূর্ণ।

তাই জ্বালানি খাতে এআই কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়াতে পারলেও পুরো ব্যবস্থাপনায় মানুষের প্রয়োজন দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

এআইয়ের যুগে চাকরির ভবিষ্যৎ কী?

বিল গেটসের আলোচনায় উঠে আসা এই তিনটি পেশা থেকে বোঝা যায়, এআইয়ের উন্নতির সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে মানুষের দায়িত্ব ও দক্ষতার চাহিদাও বদলাতে পারে। যেসব কাজে নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ বেশি, সেখানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জটিল সমস্যা সমাধান, নতুন আবিষ্কার এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে এমন কাজে মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকতে পারে।

তবে সফটওয়্যার ডেভেলপার, জীববিজ্ঞানী ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞদের চাকরি পুরোপুরি নিরাপদ, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। এসব পেশার মধ্যেও কিছু কাজ এআইয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় হতে পারে। ভবিষ্যতে টিকে থাকতে প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা অর্জন, নিয়মিত শেখা এবং নিজের বিশেষায়িত জ্ঞান বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, এআই মানুষের কাজের ধরন বদলে দিলেও কর্মক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজন পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই ঠিক হবে না। বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোই ভবিষ্যতের কর্মজগতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G