পুরুষদের তুলনায় নারীরা মাইগ্রেনে বেশি ভোগেন কেন?
তীব্র মাথাব্যথা, আলো ও শব্দ সহ্য করতে না পারা, বমি বমি ভাব কিংবা মাথার এক পাশে স্পন্দনের মতো ব্যথা। মাইগ্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছে এসব উপসর্গ বেশ পরিচিত। ব্যথার তীব্রতা এতটাই বেশি হতে পারে যে স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ রেখে অন্ধকার ও নীরব ঘরে বিশ্রাম নিতে হয়। দীর্ঘদিন এমন সমস্যা চলতে থাকলে ব্যক্তিগত জীবন, কর্মক্ষেত্র ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়ে।
মাইগ্রেন নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। তবে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা প্রায় তিন গুণ বেশি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে শরীরের হরমোনের ওঠানামাকে দায়ী করেন গবেষকেরা। বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়া অনেক নারীর মাইগ্রেনের আক্রমণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
নারীদের মাইগ্রেন বেশি হওয়ার কারণ কী?
মাইগ্রেনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র, বংশগত প্রবণতা এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন এর সঙ্গে জড়িত। নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন মাইগ্রেনের আক্রমণকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
হরমোনের ওঠানামার প্রভাব
মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে মাসিক শুরুর আগে এই হরমোনের মাত্রা দ্রুত কমে গেলে অনেকের মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হতে পারে। বয়ঃসন্ধিকাল, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজের সময়ও হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মাইগ্রেনের ধরন ও তীব্রতায় পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
মাসিকের সময় বাড়তে পারে মাথাব্যথা
অনেক নারী মাসিক শুরুর আগে বা চলাকালে মাইগ্রেনের সমস্যায় ভোগেন। একে মাসিকজনিত মাইগ্রেন বলা হয়। এ ধরনের মাথাব্যথা কখনো কখনো মাসের অন্য সময়ের তুলনায় বেশি তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে সব নারীর মাইগ্রেন মাসিকের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
মাইগ্রেনের লক্ষণ কী কী?
মাইগ্রেনের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- মাথার এক পাশে বা দুই পাশে তীব্র, স্পন্দনশীল ব্যথা।
- আলো ও শব্দে অস্বস্তি।
- বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
- চলাফেরা বা শারীরিক পরিশ্রমে ব্যথা বেড়ে যাওয়া।
- ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি।
- কারও কারও ক্ষেত্রে চোখের সামনে আলোর ঝলকানি বা আঁকাবাঁকা রেখা দেখা।
একটি মাইগ্রেনের আক্রমণ সাধারণত চার ঘণ্টা থেকে তিন দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে ব্যক্তি ও আক্রমণের ধরন অনুযায়ী এর সময়কাল ভিন্ন হয়।
কোন বিষয়গুলো মাইগ্রেন বাড়াতে পারে?
হরমোনের পরিবর্তনের পাশাপাশি কিছু অভ্যাস ও পরিবেশগত কারণও মাইগ্রেনের আক্রমণ উসকে দিতে পারে। যেমন, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং তীব্র আলো বা গন্ধ।
সবার ক্ষেত্রে একই বিষয় মাইগ্রেনের কারণ হয় না। তাই কখন মাথাব্যথা হচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে এবং কোন পরিস্থিতিতে ব্যথা বাড়ছে, তা লিখে রাখা উপকারী হতে পারে।
মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে করণীয়
নিয়মিত ঘুম, সময়মতো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ মাইগ্রেনের আক্রমণ কমাতে সহায়তা করতে পারে। ব্যথার সময় আলো ও শব্দে অস্বস্তি হলে শান্ত, অন্ধকার ঘরে বিশ্রাম নেওয়া আরাম দিতে পারে।
মাইগ্রেন ঘন ঘন হলে বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ব্যথার তীব্রতা ও আক্রমণের সংখ্যা কমানো সম্ভব। তবে অতিরিক্ত ব্যথানাশক গ্রহণ করলে উল্টো মাথাব্যথা বেড়ে যেতে পারে।
হঠাৎ জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে গেলে কিংবা কথা বলতে সমস্যা হলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
সচেতনতাই পারে ভোগান্তি কমাতে
নারীদের মধ্যে মাইগ্রেন বেশি হওয়ার পেছনে হরমোনের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এটিই একমাত্র কারণ নয়। বংশগত প্রবণতা ও জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয়ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বারবার মাথাব্যথা হলে অবহেলা না করে সঠিক কারণ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সচেতনতা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাইগ্রেনের কারণে দৈনন্দিন জীবনে তৈরি হওয়া ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রতি / এডি / শাআ



















