ডাইনোসরের আবির্ভাবের আগেই সমুদ্রে বাস করত বর্মওয়ালা অদ্ভুত উভচর

প্রকাশঃ অক্টোবর ৩১, ২০২৬ সময়ঃ ৯:১২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:১২ অপরাহ্ণ

উভচর প্রাণী বলতে সাধারণত ব্যাঙ, স্যালামান্ডার কিংবা সিসিলিয়ানের মতো প্রাণীদের বোঝায়। এদের শরীরের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাস ও শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে স্বাদুপানির ওপর নির্ভর করতে হয়। সমুদ্রের অতিরিক্ত লবণাক্ত পরিবেশে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা তাদের জন্য কঠিন। কিন্তু নতুন এক জীবাশ্ম আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র।

চীনের গুইঝাউ প্রদেশে প্রায় ২৩ কোটি ৭০ লাখ বছর আগের ট্রায়াসিক যুগের একটি সামুদ্রিক উভচর প্রাণীর প্রায় সম্পূর্ণ দুটি কঙ্কাল পাওয়া গেছে। প্রাণীটির নাম ‘গেরোথোরাক্স ম্যারিটিমাস’। আবিষ্কারটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি এমন এক উভচরের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে, যে পুরো জীবন সমুদ্রের পরিবেশে কাটাত।

প্রাণীটির দেহ ছিল গোলাকার ও চ্যাপ্টা। শরীরজুড়ে ছিল শক্ত হাড়ের বর্ম। প্রশস্ত মাথা ও বড় মুখের গঠন দেখে গবেষকদের ধারণা, এটি সমুদ্রের তলদেশে অবস্থান করে শিকারের অপেক্ষায় থাকত। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০ ইঞ্চি বা ৭৫ সেন্টিমিটার হওয়া এই প্রাণীর পৃথিবীতে বিচরণ ছিল ডাইনোসরের আবির্ভাবেরও আগে।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’-এ। গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের প্যালিওবায়োলজিস্ট রিয়োসুকে মোতানির মতে, আবিষ্কারটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক জীবনযাপনকারী একটি প্রাচীন উভচরের জীবাশ্ম পাওয়া।

সমুদ্রের তলদেশে জমে থাকা পলি থেকে তৈরি পাথরের স্তর খনন করে কঙ্কাল দুটি উদ্ধার করা হয়। একই এলাকায় প্রায় ২৩ ফুট দীর্ঘ ‘গুইঝাউইখথিওসরাস’ নামের একটি সামুদ্রিক সরীসৃপের জীবাশ্মও পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, সমুদ্রের এসব বিশাল শিকারি প্রাণীর হাত থেকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই গেরোথোরাক্স ম্যারিটিমাসের শরীরে শক্ত বর্মের বিকাশ ঘটেছিল।

প্রাণীটির মাথার খুলি ও গলার হাড়ের গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, এটি চোষার মাধ্যমে খাবার গ্রহণ করত। এ ধরনের শিকারি প্রাণী মুখের ভেতরের জায়গা দ্রুত বড় করে একধরনের নিম্নচাপ তৈরি করে। এতে আশপাশের পানি ও তার সঙ্গে থাকা ছোট শিকার মুখের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

গবেষণার সহলেখক ও পেকিং ইউনিভার্সিটির প্যালিওন্টোলজিস্ট দা-ইয়ং জিয়াং জানিয়েছেন, প্রাণীটির মাথার খুলি ছিল চ্যাপ্টা ও বেশ প্রশস্ত। বড় মুখে সারিবদ্ধভাবে অসংখ্য ছোট শঙ্কু আকৃতির দাঁত ছিল। সমুদ্রের কাদা ও পলিময় তলদেশে বসবাস করে পাশ দিয়ে যাওয়া মাছ, কৃমি কিংবা স্কুইডজাতীয় প্রাণী শিকার করত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শিকার ধরার কৌশলের দিক থেকে বর্তমান সময়ের ওবেগং হাঙরের সঙ্গে এর কিছুটা মিল রয়েছে। ওবেগং হাঙরও সমুদ্রের তলদেশে অবস্থান করে সুযোগ বুঝে শিকার ধরে। তবে দুটি প্রাণী সম্পূর্ণ ভিন্ন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, গেরোথোরাক্স ম্যারিটিমাসের পূর্বপুরুষ ছিল স্বাদুপানিতে বসবাসকারী বর্মওয়ালা উভচর। বিবর্তনের ধারায় তাদের বংশধরেরা ধীরে ধীরে সামুদ্রিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয়। এর আগে একই ধরনের কাছাকাছি কিছু উভচরের জীবাশ্ম স্বাদুপানির পরিবেশে পাওয়া গিয়েছিল।

যেভাবে সমুদ্রের লবণাক্ত পরিবেশে টিকে ছিল

বর্তমান পৃথিবীতে ব্যাঙ, স্যালামান্ডার ও সিসিলিয়ানসহ আট হাজারের বেশি প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে। এদের কিছু প্রজাতি নদীর মোহনা কিংবা মিষ্টি ও নোনা পানির মিশ্র পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে। তবে খুব অল্পসংখ্যক প্রজাতিই সরাসরি নোনা পানি সহ্য করতে সক্ষম। তাদের মধ্যেও পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক জীবনযাপনের নজির নেই।

এর প্রধান কারণ উভচর প্রাণীর ত্বকের বিশেষ গঠন। তাদের ত্বক শুধু বাইরের আবরণ হিসেবে কাজ করে না, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরে পানির ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমুদ্রের অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে।

গবেষক মোতানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ব্যাঙ সমুদ্রের পানিতে সাঁতার কাটলে অসমোটিক চাপের কারণে তার শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যেতে থাকে। ফলে দেহে পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং ওজন কমতে শুরু করে। এ অবস্থায় সুস্থ থাকতে তাকে আবার স্বাদুপানির পরিবেশে ফিরে যেতে হয়। এ ধরনের শারীরবৃত্তীয় সীমাবদ্ধতার কারণেই উভচর প্রাণীদের জন্য সম্পূর্ণ সামুদ্রিক জীবনযাপন কঠিন।

তবে গেরোথোরাক্স ম্যারিটিমাস এই বাধা অতিক্রম করতে পেরেছিল বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, ‘এক্সাপ্টেশন’ নামের একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া এতে ভূমিকা রেখেছিল। এ প্রক্রিয়ায় কোনো জীবের একটি বৈশিষ্ট্য প্রথমে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে তৈরি হলেও পরবর্তী সময়ে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, প্রাণীটির পূর্বপুরুষদের শরীরে শিকারির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে শক্ত বর্ম তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই সামুদ্রিক পরিবেশে টিকে থাকার সহায়ক হয়ে ওঠে। বর্মের কারণে ত্বকের সঙ্গে নোনা পানির সরাসরি সংস্পর্শ কমে যায়। অনেকটা পানির নিচে কাজ করার সময় মানুষের ডাইভিং স্যুট ব্যবহারের মতোই এটি সুরক্ষা দিত।

এ ছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণীটি মুখ দিয়ে নোনা পানি গ্রহণ করত এবং পরবর্তী সময়ে ফুলকার মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ শরীর থেকে বের করে দিতে পারত। এভাবেই শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রেখে সামুদ্রিক পরিবেশে বসবাস করা সম্ভব হয়েছিল।

জীবাশ্মের ক্ষেত্রে অনেক সময় স্থলচর কিংবা স্বাদুপানির প্রাণীর মৃতদেহ পানিতে ভেসে সমুদ্রে গিয়ে জমা হয়। তাই শুধু সমুদ্রের তলদেশে কোনো প্রাণীর কঙ্কাল পাওয়া গেলেই সেটিকে সামুদ্রিক প্রাণী হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না।

কিন্তু গেরোথোরাক্স ম্যারিটিমাসের ক্ষেত্রে গবেষকেরা পেয়েছেন আরও শক্ত প্রমাণ। এর হাড়ের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে ট্রায়াসিক যুগের সমুদ্রের পানির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। এতে ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে প্রাণীটি কেবল সমুদ্রে ভেসে আসেনি, বরং সেখানেই বেড়ে উঠেছিল এবং জীবন কাটিয়েছিল।

নতুন এই আবিষ্কার নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন গবেষক রিয়োসুকে মোতানি। তাঁর মতে, প্রাণীটির অস্বাভাবিক শারীরিক গঠন এবং সামুদ্রিক পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা একে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বিশাল সামুদ্রিক সরীসৃপের পাশাপাশি একই সময়ে একটি উভচর প্রাণীর এমন জীবনযাপন ছিল তাঁর কাছেও কল্পনাতীত।

গবেষকদের এই আবিষ্কার প্রাচীন উভচর প্রাণীদের বিবর্তন ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইতিহাস সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করছে, অতীতে প্রাণিজগতে এমন কিছু অভিযোজন ঘটেছিল, যা বর্তমান সময়ের বিজ্ঞানীদের কাছেও বিস্ময়কর।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

20G