কৃষিতে ন্যানো ইউরিয়ার ব্যবহার, সাশ্রয় হতে পারে হাজার কোটি টাকা

প্রকাশঃ নভেম্বর ৬, ২০২৬ সময়ঃ ৮:২০ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:২০ অপরাহ্ণ

কৃষিতে সারের ব্যবহার কমিয়ে উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তিকে ঘিরে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এক গবেষকের উদ্ভাবিত এই তরল সার সম্প্রতি বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিসের অনুমোদন পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও কৃষকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হলে দেশের কৃষি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

দীর্ঘ পাঁচ বছর দুই মাসের কারিগরি ও আইনি যাচাই শেষে গত ২৫ অক্টোবর ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অনুমোদন দেওয়া হয়। এর উদ্ভাবক যবিপ্রবির কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ন্যানোটেকনোলজি গবেষক ড. মো. জাভেদ হোসেন খান। তাঁর উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি সফলভাবে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে প্রচলিত ইউরিয়া সারের ব্যবহার, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় এবং বিদেশ থেকে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ন্যানো ইউরিয়ায় উৎপাদন ব্যয় কমার সম্ভাবনা

উদ্ভাবক ড. জাভেদ হোসেন খানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত দানাদার ইউরিয়া জমিতে প্রয়োগের পর এর একটি বড় অংশ গাছের কাজে লাগে না। তাঁর দাবি, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইউরিয়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, আবার কিছু বৃষ্টির পানির সঙ্গে মাটির গভীরে চলে যায়। ফলে উদ্ভিদ কার্যকরভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে।

অন্যদিকে, উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া তরল অবস্থায় ব্যবহার করা হয়। স্প্রে মেশিনের সাহায্যে গাছের পাতায় এটি প্রয়োগ করতে হয়। এর ক্ষুদ্র কণাগুলো পাতার মাধ্যমে উদ্ভিদে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। উদ্ভাবকের দাবি, এ পদ্ধতিতে সারের কার্যকারিতা ৯০ শতাংশের বেশি হতে পারে।

উদ্ভাবকের দেওয়া অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারে প্রতি বিঘা জমিতে কৃষকের প্রায় ৪ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় হয়। সেখানে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে খরচ হতে পারে মাত্র ২৩০ টাকা। তাঁর দাবি, এতে সমপরিমাণ বা আরও ভালো ফলন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এই হিসাব বাস্তবে সব ফসল ও জমিতে একইভাবে কার্যকর হবে কি না, তা আরও বিস্তৃত ও স্বাধীন মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে উদ্ভাবকের হিসাব অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি কার্যকর হলে সারের পেছনে কৃষকের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

সার আমদানি ও ভর্তুকির চাপ কমানোর সুযোগ

বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন ধরে রাখতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া সার প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হয়। এর বড় একটি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

আমদানির জন্য সরকারকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি কৃষকদের কাছে তুলনামূলক কম দামে সার পৌঁছে দিতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকিও দিতে হয়। ফলে সার আমদানি ও ভর্তুকি দেশের অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করে।

ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে প্রচলিত ইউরিয়ার চাহিদা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকির চাপ কমতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি দূর হবে কি না, তা নির্ভর করবে ন্যানো ইউরিয়ার উৎপাদন সক্ষমতা, ফসলভেদে কার্যকারিতা, বাজারমূল্য এবং কৃষকের গ্রহণযোগ্যতার ওপর। এসব বিষয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হাজার কোটি টাকার সাশ্রয়কে সম্ভাবনা হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

পরিবেশ রক্ষায় নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা

কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের প্রভাব শুধু উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য, পানির গুণগত মান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ও জড়িত।

প্রচলিত ইউরিয়া সার ব্যবহারের ফলে মাটি থেকে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হতে পারে। এটি একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। আবার অতিরিক্ত নাইট্রোজেন মাটির গভীরে চুইয়ে ভূগর্ভস্থ পানির দূষণের কারণ হতে পারে।

ন্যানো ইউরিয়া সরাসরি গাছের পাতায় প্রয়োগ করা হয় বলে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে মাটিতে সারের অপচয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। এতে পরিবেশে নাইট্রোজেনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্তারও কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিটি যদি প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে পারে, তাহলে পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণেও ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ক্ষুধামুক্তি ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক হতে পারে।

পাঁচ বছরের গবেষণার পর পেটেন্ট অনুমোদন

যবিপ্রবির ন্যানো-বায়ো অ্যান্ড অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং (ন্যাম) ল্যাবে ২০১৯ সাল থেকে ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসেন খান।

দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। উদ্ভাবনটির মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের জন্য ২০২১ সালে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনি যাচাই-বাছাই শেষে গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিস থেকে পেটেন্ট অনুমোদন দেওয়া হয়।

এই অনুমোদনের ফলে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মেধাস্বত্ব সুরক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হয়েছে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি ন্যানো ইউরিয়ার কার্যকারিতা যাচাইয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষাও চালানো হয়েছে।

যশোরের আব্দুলপুর, বগুড়ার শেরপুর ও গাজীপুরে বিভিন্ন ধরনের ফসলের ওপর এসব পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কৃষকেরা প্রচলিত সারের তুলনায় ভালো ফল পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

দেশের বাইরেও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্ভাবক ও বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় ন্যানো ইউরিয়া সফল হয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জৈবসার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোলাবায়োর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজে লাগানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাণিজ্যিক উৎপাদনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

পেটেন্ট অনুমোদন পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও কৃষকের হাতে প্রযুক্তিটি পৌঁছে দিতে আরও কয়েকটি কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বড় পরিসরে উৎপাদনের ব্যবস্থা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বাজারজাতকরণ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ন্যানো ইউরিয়ার উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় সার কারখানা কিংবা বেসরকারি কৃষি ও সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার সুযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ দানাদার ইউরিয়ার পরিবর্তে পাতায় স্প্রে করে তরল সার প্রয়োগের পদ্ধতি অনেক কৃষকের কাছে নতুন।

কোন ফসলে কতটুকু ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করতে হবে, কখন প্রয়োগ করতে হবে এবং প্রচলিত সারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী, এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি। পাশাপাশি বিভিন্ন মাটির ধরন ও আবহাওয়ায় এর কার্যকারিতাও যাচাই করতে হবে।

গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অনুমোদনকে যবিপ্রবি ও দেশের গবেষণাক্ষেত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর।

তিনি বলেন, এই অর্জন যবিপ্রবি পরিবার এবং পুরো দেশের জন্য গর্বের বিষয়। প্রযুক্তিটি কৃষি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এর মাধ্যমে উৎপাদন খরচ ও সার আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে, উদ্ভাবক ড. জাভেদ হোসেন খান ২০২৫ সালে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হন। তাঁর মতে, কৃষকের উপকার এবং পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিটি দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের আশা, ন্যানো ইউরিয়ার বাণিজ্যিক উৎপাদন সফল হলে দেশের কৃষকেরা কম খরচে ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশের বাজারেও এই প্রযুক্তির তৈরি সার রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন আরও বিস্তৃত গবেষণা, নির্ভরযোগ্য ফলন যাচাই, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষকের কাছে সাশ্রয়ী দামে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

November 2026
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
20G