ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠে ছোট্ট একটি শহর বন্ডি। অভিবাসী পরিবার, সীমিত সুযোগ-সুবিধা আর সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের মধ্যেই বেড়ে ওঠা এই শহর একসময় বিশ্বকে উপহার দেয় এক অসাধারণ ফুটবলারকে। তার নাম কিলিয়ান এমবাপ্পে।
আজ তিনি বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ক্রীড়াবিদদের একজন। কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা, অসংখ্য গোল, রেকর্ড আর শিরোপায় ভরা তার ক্যারিয়ার। কিন্তু এই সাফল্যের শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ।
১৯৯৮ সালের ২০ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এমবাপ্পের জীবনে ফুটবল যেন শুরু থেকেই ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার বাবা উইলফ্রিড এমবাপ্পে ছিলেন স্থানীয় ফুটবল কোচ, আর মা ফায়জা লামারি ছিলেন পেশাদার হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। খেলাধুলার পরিবেশেই বড় হওয়া এমবাপ্পে ছোটবেলা থেকেই অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন। বল পায়ে তার গতি, আত্মবিশ্বাস এবং খেলার বুদ্ধিমত্তা খুব দ্রুতই সবার নজর কাড়ে।
তখনও কেউ জানত না, বন্ডির মাঠে ছুটে বেড়ানো সেই ছেলেটিই একদিন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের নাম লিখে রাখবে।
ছোটবেলায় এমবাপ্পের ঘরের দেয়ালে ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পোস্টার। রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ দেখেই বড় হয়েছেন তিনি। একসময় সেই ক্লাবের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতেন। কিশোর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের ট্রায়ালে অংশ নিতে স্পেনে যান এবং কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের সঙ্গেও দেখা করেন। তবে ভাগ্য তাকে প্রথমে নিয়ে যায় মোনাকোতে।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তার। মোনাকোর জার্সিতে খেলেই ইউরোপের নজরে আসেন এমবাপ্পে। ২০১৬-১৭ মৌসুমে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স মোনাকোকে ফরাসি লিগ শিরোপা জিততে সাহায্য করে। একই সঙ্গে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো তাকে দলে ভেড়ানোর জন্য প্রতিযোগিতায় নামে।
২০১৭ সালে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনে যোগ দিয়ে তিনি নিজের ক্যারিয়ারকে নিয়ে যান নতুন উচ্চতায়। গোলের পর গোল, রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে পিএসজির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠেন। টানা ছয়বার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব জিতে নিজের আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা করেন।
তবে এমবাপ্পের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০১৮ সালে। রাশিয়া বিশ্বকাপে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি বিশ্বকে দেখিয়ে দেন নিজের সামর্থ্য। ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ফাইনালে গোল করে পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার কীর্তি গড়েন।
চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে তিনি আবারও ইতিহাসের কেন্দ্রে চলে আসেন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে একাই করেন হ্যাটট্রিক। যদিও ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত শিরোপা হারায়, তবুও সেই রাতকে অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে মনে করেন।
এরপর আসে শৈশবের স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। বহু বছরের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন এমবাপ্পে। যে ক্লাবের জার্সি পরে খেলার স্বপ্ন তিনি ছোটবেলা থেকে দেখতেন, অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
মাঠের বাইরেও এমবাপ্পের গল্প কম আকর্ষণীয় নয়। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি ফরাসি ক্লাব এসএম কাঁ-র অন্যতম মালিক হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদদের একজন। আর তার গতি নিয়ে তো আলাদা গল্পই আছে। ২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে ঘণ্টায় প্রায় ৩৭ কিলোমিটার গতিতে দৌড়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি।
অবশ্য সমালোচনাও রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আক্রমণে অসাধারণ হলেও রক্ষণাত্মক দায়িত্ব পালনে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে তার। তবে এমবাপ্পে নিজেও স্বীকার করেছেন, আরও পরিপূর্ণ ফুটবলার হওয়ার জন্য তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করছেন।
২৭ বছর বয়সেই বিশ্বকাপ, নেশনস লিগ, অসংখ্য লিগ শিরোপা, শত শত গোল এবং অগণিত ব্যক্তিগত পুরস্কারে ভরে গেছে তার অর্জনের ঝুলি। তবুও মনে হয়, এ যেন কেবল শুরু।
কারণ কিলিয়ান এমবাপ্পে এখন আর শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি প্রজন্মের প্রতীক, একটি স্বপ্নের নাম।
বন্ডির সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। আর ফুটবল বিশ্ব এখনও অপেক্ষা করছে, তার গল্পের পরবর্তী অধ্যায়ে নতুন কোন ইতিহাস লেখা হয় তা দেখার জন্য।
প্রতি / এডি / শাআ
কোটি টাকার বেতন ছেড়ে পর্তুগালের কোচ হতে যাচ্ছেন হোর্হে হেসুস
বিশ্বকাপের মাঠে শিশুদের কানে হেডফোন ব্যবহার করা হয় কেন? জানুন আসল কারণ
বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইতিহাসের নতুন মাইলফলক ছুঁলেন মেসি ও জকোভিচ
‘আমার আগে কিছুই জেতেনি পর্তুগাল’, বিদায়ের বার্তায় রোনালদো
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা ৭ কিংবদন্তি ফুটবলার
ফ্রান্সের জার্সিতে কেন মুরগির প্রতীক? জানুন এর পেছনের ইতিহাস
বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে ফিফার বিরুদ্ধে বিলিয়ন ডলারের মামলা ইরানের
পেনাল্টির ঠিক আগে রোনালদো কি আবারও বললেন ‘বিসমিল্লাহ’?
বাংলাদেশকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে আইসিসির কাছে সাবেক বিসিবি সভাপতির চিঠি
ফের আলোচনায় ঘানার সেই তান্ত্রিক, এবার আর্জেন্টিনাকে নিয়ে দিলেন দুঃসংবাদ