আমাজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা, কী হতে পারে ১০০ বছর পর?

প্রকাশঃ জুন ২৭, ২০২৬ সময়ঃ ১১:০৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:০৮ অপরাহ্ণ

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রান্তীয় রেইনফরেস্ট আমাজন শুধু একটি বন নয়, এটি বৈশ্বিক পরিবেশের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক। প্রায় ২০ লাখ বর্গমাইল এলাকায় বিস্তৃত এই অরণ্য বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে। একই সঙ্গে এটি পৃথিবীর পানিচক্র সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এবং অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্বও এই বনের ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু একসময় যে বনকে পৃথিবীর ‘সবুজ ফুসফুস’ বলা হতো, সেটিই এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। কয়েক দশকের অব্যাহত বন উজাড়, কৃষি সম্প্রসারণ, খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাজনের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে। গবেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে আগামী এক শতাব্দীতে এই বন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আমাজনের প্রায় ১৭ শতাংশ বন ধ্বংস হয়েছে। এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে কৃষিজমি, গবাদিপশুর খামার এবং বিভিন্ন শিল্প কার্যক্রম। একই সঙ্গে অবৈধ কাঠ কাটা ও খনিজ অনুসন্ধানের মতো কর্মকাণ্ড বনটির প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে তুলছে।

স্পেনের সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বের্নার্দো ফ্লোরেসের মতে, বর্তমানে তিনটি বড় সংকট একসঙ্গে আমাজনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এগুলো হলো জলবায়ু পরিবর্তন, ব্যাপক বন উজাড় এবং দাবানল। এই তিনটি কারণ একে অপরকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে, ফলে বন দ্রুত ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বন কমে গেলে বৃষ্টিপাতও কমে যায়। বৃষ্টিপাত কমে গেলে গাছপালা শুকিয়ে পড়ে এবং দাবানলের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার আগুনে বন ধ্বংস হলে আরও কমে যায় বৃষ্টিপাত। এভাবেই একটি ক্ষতিকর চক্র তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত পুরো বনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।

বিশেষ উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে আমাজনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল, যেখানে বন উজাড় সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। এসব এলাকায় বড় বড় গাছের পরিবর্তে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে পরজীবী লতা ও আগ্রাসী উদ্ভিদ। এগুলো সূর্যালোক ও পুষ্টির জন্য স্থানীয় গাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, ফলে ধীরে ধীরে বন তার স্বাভাবিক বৈচিত্র্য হারাচ্ছে।

এ ছাড়া মানুষের আনা বিদেশি ঘাসও নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই ঘাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় উদ্ভিদকে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে বন ধীরে ধীরে তৃণভূমির মতো রূপ নিলেও সেখানে আগের মতো জীববৈচিত্র্য আর থাকবে না।

এর প্রভাব শুধু গাছেই সীমাবদ্ধ নয়। বন কমে যাওয়ায় নদী, জলাভূমি এবং জলজ প্রাণীর বাসস্থানও হুমকির মুখে পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও দাবানলের কারণে অনেক প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে বহু প্রজন্ম ধরে এই বনে বসবাস করা আদিবাসী জনগোষ্ঠীও জীবিকা হারিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাজনের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেলে তার প্রভাব পুরো পৃথিবীতে পড়বে। দক্ষিণ আমেরিকায় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে, মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলবে এবং সমুদ্রের স্রোতেও পরিবর্তন আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব পরিবর্তন বিশ্বের জলবায়ুকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

তবে সবকিছুর পরও আশার আলো দেখছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, বন উজাড় বন্ধ করা, অবৈধ দখল রোধ করা এবং বড় পরিসরে পুনঃবনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে আমাজনের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই রেইনফরেস্টকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা এখনও সম্ভব।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G