মাত্র দুই মাসের অতিথি বরফের এই শহর, তারপরই মিলিয়ে যায় অস্তিত্ব
পৃথিবীর কিছু পর্যটন গন্তব্য এমন, যেগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ থাকে খুব অল্প সময়ের জন্য। চীনের উত্তরাঞ্চলের শহর হারবিন তেমনই একটি জায়গা। প্রতি শীতে বরফ ও তুষার দিয়ে গড়ে ওঠে বিশাল এক নগরী, যা বসন্তের উষ্ণতা শুরু হতেই ধীরে ধীরে গলে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই এই বরফ শহর দেখতে চাইলে সময়ের হিসাবটা ঠিক রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের হেইলুংচিয়াং প্রদেশের রাজধানী হারবিন দেশের সবচেয়ে শীতল অঞ্চলগুলোর একটি। শীতকালে এখানকার তাপমাত্রা অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় বিশাল বরফের স্থাপনা নির্মাণের আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। জমে যাওয়া নদী থেকে কাটা বিশাল বরফের ব্লক দিয়ে শিল্পীরা তৈরি করেন দুর্গ, প্রাসাদ, সেতু, টানেল এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত স্থাপনার অনুকরণে অসাধারণ সব ভাস্কর্য।
এই বরফের রাজ্যের মূল আকর্ষণ হারবিন আইস অ্যান্ড স্নো ওয়ার্ল্ড। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বরফ ও তুষারভিত্তিক থিম পার্কগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। বিশাল বরফের স্থাপনা, বরফের স্লাইড এবং নান্দনিক ভাস্কর্য দেখতে প্রতিবছর বিশ্বের নানা দেশ থেকে পর্যটক এখানে ভিড় জমান।
দিনের আলোয় বরফের স্বচ্ছ সৌন্দর্য মুগ্ধ করলেও সূর্য ডুবে যাওয়ার পর যেন বদলে যায় পুরো পরিবেশ। রঙিন এলইডি আলোর সাজে বরফের স্থাপনাগুলো নীল, সবুজ, গোলাপি ও বেগুনি আলোয় ঝলমল করে ওঠে। তখন পুরো এলাকাটি রূপ নেয় রূপকথার এক আলোকিত নগরীতে। এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে প্রতি বছর অসংখ্য আলোকচিত্রীও হারবিনে ছুটে আসেন।
শুধু বরফের স্থাপনা দেখাই নয়, এখানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের শীতকালীন বিনোদনের সুযোগ। বরফের স্লাইডে নামা, স্কেটিং করা কিংবা বিশাল তুষার ভাস্কর্যে সাজানো সান আইল্যান্ড সিনিক এরিয়া ঘুরে দেখা পর্যটকদের অন্যতম পছন্দ। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে স্থানীয় দংবেই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গরম খাবারও ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
হারবিনের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। চীনা ও রুশ সংস্কৃতির প্রভাব এই শহরের স্থাপত্য, ধর্মীয় স্থাপনা এবং খাদ্যসংস্কৃতিতে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। উনিশ শতকের শেষ ভাগে চাইনিজ ইস্টার্ন রেলওয়ে নির্মাণের পর বিভিন্ন দেশের মানুষের বসতি গড়ে ওঠায় শহরটি বহুজাতিক সংস্কৃতির এক অনন্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
প্রতি বছর সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ কিংবা জানুয়ারির শুরুতে হারবিন ইন্টারন্যাশনাল আইস অ্যান্ড স্নো ফেস্টিভ্যাল শুরু হয় এবং ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে। তবে জানুয়ারিকে এই উৎসব উপভোগের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ধরা হয়। কারণ তখন সব বরফের স্থাপনার নির্মাণ শেষ হয়ে যায় এবং তীব্র ঠান্ডার কারণে সেগুলো সবচেয়ে সুন্দর অবস্থায় থাকে।
শীতকালে হারবিনের তাপমাত্রা প্রায়ই মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে নেমে যায়। তাই সেখানে ভ্রমণে গেলে থার্মাল পোশাক, ভারী জ্যাকেট, গ্লাভস, গরম বুট ও শীত প্রতিরোধী প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সঙ্গে রাখা জরুরি।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য টিকে থাকা এই বরফ নগরী প্রমাণ করে, পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর কিছু সৌন্দর্য স্থায়ী নয়। প্রতি বছর গড়ে ওঠা এবং আবার গলে হারিয়ে যাওয়া হারবিনের এই বরফের শহর তাই ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতার নাম।
প্রতি / এডি / শাআ









