কেন অ্যান্টার্কটিকার ওপর দিয়ে বিমান চলে না?
বিশ্বের আকাশপথ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, উত্তর গোলার্ধের অনেক দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইট উত্তর মেরুর কাছাকাছি পথ ব্যবহার করে চলাচল করে। উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপ কিংবা এশিয়ায় যাওয়ার সময় বিমানগুলো প্রায়ই গ্রিনল্যান্ড বা উত্তর মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। কিন্তু দক্ষিণ মেরু বা অ্যান্টার্কটিকার আকাশে বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমানের উপস্থিতি খুবই বিরল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক বাস্তবতা, যাত্রী চাহিদা, নিরাপত্তা এবং আবহাওয়াজনিত নানা কারণ।
ছোট পথের সুবিধা নেয় উত্তর গোলার্ধ
বিমান চলাচলে সাধারণত মানচিত্রের সরল রেখা নয়, বরং সবচেয়ে কম দূরত্বের ‘গ্রেট সার্কেল রুট’ ব্যবহার করা হয়। উত্তর গোলার্ধের বড় শহরগুলোর অবস্থান এমন যে নিউইয়র্ক থেকে টোকিও বা লন্ডন থেকে হংকংয়ের মতো রুটে উত্তর মেরুর কাছ দিয়ে গেলে দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এতে জ্বালানি খরচ কম হয় এবং যাত্রার সময়ও বাঁচে। ফলে এই পথ এয়ারলাইনগুলোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভজনক।
দক্ষিণ গোলার্ধে প্রয়োজন পড়ে না
দক্ষিণ গোলার্ধে বড় শহরগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক দূরে দূরে অবস্থিত। সিডনি, জোহানেসবার্গ কিংবা সান্তিয়াগোর মতো শহরের মধ্যে ফ্লাইট চললেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমুদ্রপথ ব্যবহার করলেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। তাই অ্যান্টার্কটিকা অতিক্রম করার প্রয়োজন খুব একটা তৈরি হয় না।
এ ছাড়া অ্যান্টার্কটিকায় স্থায়ী জনবসতি, বড় শহর বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র না থাকায় সেখানে যাত্রী পরিবহনের চাহিদাও নেই বললেই চলে। ফলে এই অঞ্চলে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনায় এয়ারলাইনগুলোর আগ্রহ কম।
জরুরি অবতরণের সুবিধা নেই
বিমান চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো জরুরি পরিস্থিতিতে কাছাকাছি বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণের সুযোগ থাকা। উত্তর মেরু অঞ্চলে আলাস্কা, কানাডা, আইসল্যান্ড ও নরওয়ের মতো দেশে আধুনিক বিমানবন্দর রয়েছে, যা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
কিন্তু অ্যান্টার্কটিকায় সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের জন্য উপযোগী কোনো বাণিজ্যিক বিমানবন্দর নেই। সেখানে থাকা কিছু বরফঢাকা রানওয়ে মূলত গবেষণা কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়।
চরম আবহাওয়া বড় বাধা
অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা ও প্রতিকূল পরিবেশের অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে তাপমাত্রা অনেক সময় মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়। তীব্র তুষারঝড়, দীর্ঘ সময়ের অন্ধকার এবং ‘হোয়াইট আউট’ পরিস্থিতির কারণে দৃশ্যমানতা দ্রুত কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিবেশে জরুরি অবতরণ বা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। তাই বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনায় এই অঞ্চলকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইতিহাসও তৈরি করেছে সতর্কতা
স্নায়ুযুদ্ধের সময় উত্তর মেরু অঞ্চল সামরিক ও কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় সেখানে নেভিগেশন ও অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটে। পরবর্তীতে সেটিই বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্য সহায়ক হয়। কিন্তু অ্যান্টার্কটিকায় তেমন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
এ ছাড়া ১৯৭৯ সালে একটি পর্যটনবাহী বিমান অ্যান্টার্কটিকার মাউন্ট ইরেবাসে বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা এই অঞ্চলের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সতর্কতা তৈরি করে।
এখনো সীমিত আকাশপথ
বর্তমানে কিছু আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন দক্ষিণ গোলার্ধের দীর্ঘ রুটে চলাচলের সময় অ্যান্টার্কটিকার উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে উড়ে যায়। তবে সেগুলোও নির্দিষ্ট নিরাপত্তা নিয়ম ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই পরিচালিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতি হলেও অবকাঠামোর অভাব ও চরম আবহাওয়ার কারণে অ্যান্টার্কটিকা এখনো বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমানের জন্য অত্যন্ত সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ আকাশপথ হিসেবেই রয়ে গেছে।
প্রতি / এডি / শাআ












