‘নির্মল বাতাসের শহর’ খ্যাত রাজশাহীত এখন যেন শুধুই স্মৃতি
একসময় দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও স্বস্তিদায়ক শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল রাজশাহী। নির্মল বাতাস, সবুজ পরিবেশ এবং তুলনামূলক কম যানজটের কারণে শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা পরিচিতি পেয়েছিল। রাজধানী ঢাকার দূষিত পরিবেশের বিপরীতে রাজশাহীকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন নগরজুড়ে বাড়ছে ধুলাবালি, কমছে সবুজ এবং সংকুচিত হচ্ছে জলাশয়।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে রাজশাহীর বাতাসে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ধুলিকণার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পিএম ২.৫-এর পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সূক্ষ্ম কণা মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তালাইমারী এলাকায় পিএম ২.৫-এর সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল ৭৬ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭-এ। আর ২০২৫ সালে রেলগেট এলাকায় এই মাত্রা ১২৫ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। তিন বছরের ব্যবধানে দূষণের পরিমাণ প্রায় ৬৪ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শুধু পরিসংখ্যান নয়, নগরবাসীর অভিজ্ঞতাও একই চিত্র তুলে ধরছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও রাজশাহীতে এত ধুলাবালি দেখা যেত না। এখন সকালবেলা দোকান বা অফিস খুলেই ধুলা পরিষ্কার করতে হচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, কিছু সময় জানালা খোলা রাখলেই ঘরের ভেতরে ধুলার স্তর জমে যায়।
ঢাকা থেকে রাজশাহী ভ্রমণে আসা অনেক দর্শনার্থীও পরিবর্তিত পরিবেশ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল নির্মল বাতাসের শহর, কিন্তু বাস্তবে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধুলার কারণে মাস্ক ব্যবহার করতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজশাহীর বর্তমান বায়ুদূষণের অন্যতম বড় কারণ অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে সড়ক, ড্রেন ও অবকাঠামো উন্নয়নকাজ চলছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রী খোলা অবস্থায় পড়ে থাকছে এবং পরিবহনের সময়ও যথাযথভাবে ঢেকে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে বাতাসে সহজেই ধুলিকণা ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিবেশবিদরা আরও বলছেন, নগরীতে বড় গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াও দূষণ বৃদ্ধির একটি কারণ। আগে বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় থাকা বড় গাছগুলো বাতাসের ধুলা শোষণ করে পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করত। কিন্তু সড়ক সম্প্রসারণ ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অনেক পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
একই সঙ্গে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জলাশয় ভরাটের প্রবণতা। ছোট-বড় পুকুর ও খাল ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় শুধু পানি সংরক্ষণই করে না, এটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, পিএম ২.৫ ধরনের সূক্ষ্ম ধুলিকণা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যালার্জি এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। শিশু, বয়স্ক এবং আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণস্থলে নিয়মিত পানি ছিটানো, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে পরিবহন করা এবং পরিবেশগত নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে দূষণের মাত্রা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নগরীতে নতুন করে সবুজায়ন বাড়ানো এবং জলাশয় সংরক্ষণেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় নির্মল বাতাসের জন্য পরিচিত রাজশাহী ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত সংকটে পড়তে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ









