অদৃশ্য হওয়ার শহর: জাপানে যারা নিজেরাই হারিয়ে যায়

প্রকাশঃ মার্চ ৩, ২০২৬ সময়ঃ ৯:০২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:০২ অপরাহ্ণ

টোকিওর ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আপনি কাউকে লক্ষ্য করবেন না। সবাই দ্রুত হাঁটছে, ট্রেন ধরছে, মোবাইলে চোখ রেখে হিসেব কষছে জীবনের। এই শহরে মানুষ হারিয়ে গেলে খুব বেশি শব্দ হয় না। কেউ চিৎকার করে না, রাস্তায় পোস্টার ঝোলে না সব সময়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া মানুষটি নিজেই চেয়েছে—সে যেন আর খুঁজে না পাওয়া যায়।

জাপানে এমন মানুষদের একটি নাম আছে—‘জোহাতসু’। শব্দটির অর্থ বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাওয়া। যেন গরম কেটলির ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠে আকাশে মিশে গেল—ছিল, কিন্তু এখন আর নেই।

এই হারিয়ে যাওয়াটা হঠাৎ কোনো রোমাঞ্চ নয়। এর পেছনে থাকে ক্লান্তি, অপমান, ঋণের পাহাড়, ভাঙা সম্পর্ক, কিংবা এমন এক সামাজিক চাপ—যেখানে ব্যর্থতার কোনো জায়গা নেই। জাপানি সমাজে সাফল্য মানে কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; সেটি পরিবারের সম্মান, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, এমনকি নিজের অস্তিত্বের বৈধতা। সেখানে একবার হোঁচট খেলে অনেকেই মনে করেন—ফিরে দাঁড়ানোর চেয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সহজ।

ধরা যাক, একজন মধ্যবয়সী কর্মী। দশ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। হঠাৎ কোম্পানি সংকটে পড়েছে, চাকরি চলে গেছে। নতুন কাজ পাচ্ছেন না। ব্যাংকের কিস্তি বাকি, সন্তানের স্কুলের ফি জমে আছে। প্রতিদিন পরিবারকে আশ্বস্ত করছেন—সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ভেঙে পড়ছেন। একদিন হয়তো তিনি সিদ্ধান্ত নেন—চুপচাপ চলে যাবেন। পরিবারের ঘুম ভাঙার আগেই।

জাপানে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও আছে, যারা রাতের অন্ধকারে মানুষকে নতুন ঠিকানায় পৌঁছে দেয়। পুরোনো ফোন নম্বর বন্ধ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট গুটিয়ে ফেলা, পরিচিতদের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন—সব কিছু হয় নিঃশব্দে। নতুন শহরে গিয়ে হয়তো তিনি ছোটখাটো কাজে যোগ দেন, নিজের নাম বদলে ফেলেন।

কিন্তু সত্যিই কি সব বদলে যায়?

যে মানুষটি হারিয়ে যান, তিনি কি অতীত থেকে মুক্তি পান? নাকি প্রতি রাতে ঘুমের ভেতর পুরোনো বাড়ির দরজা, সন্তানের মুখ, স্ত্রীর কণ্ঠ তাকে তাড়া করে ফেরে? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। কারণ তারা কথা বলেন না। তারা আলোচনায় আসেন না। তারা সংবাদ শিরোনাম হতে চান না।

অন্যদিকে, পরিবারের গল্পটি আরও নির্মম। একজন মা অপেক্ষা করেন—হয়তো একদিন দরজায় কড়া নাড়বে তার ছেলে। একজন স্ত্রী প্রতিদিন ফোনের স্ক্রিনে তাকান—অচেনা নম্বর থেকে কল এলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সন্তানেরা বড় হয় এক অদৃশ্য শূন্যতা নিয়ে। আইনগতভাবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হন, তাকে খুঁজে বের করার সীমাবদ্ধতা থাকে। ফলে অপেক্ষাটাই হয়ে ওঠে স্থায়ী বাস্তবতা।

জাপান দীর্ঘদিন ধরে আত্মহত্যার উচ্চ হারের জন্য পরিচিত। অনেক গবেষক বলেন, ‘জোহাতসু’ হয়তো সেই মৃত্যুর এক বিকল্প। মৃত্যু নয়, কিন্তু পরিচয়ের মৃত্যু। শারীরিকভাবে বেঁচে থাকা, অথচ সামাজিকভাবে মৃত হয়ে যাওয়া। এটি কি কাপুরুষতা? নাকি বেঁচে থাকার এক মরিয়া চেষ্টা?

সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। কর্মক্ষেত্রের কঠোরতা, সামাজিক লজ্জার ভয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না থাকা—সব মিলিয়ে এমন এক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ ভাঙে কিন্তু প্রকাশ পায় না। কান্না চাপা থাকে, যন্ত্রণা গোপন থাকে। আর একসময় কেউ কেউ ভাবেন—নিজেকে মুছে ফেলাই শেষ সমাধান।

এই গল্প শুধু জাপানের নয়। এটি আমাদের সময়ের গল্প। আমরা সবাই কোনো না কোনো চাপের ভেতর বাঁচি। সামাজিক মাধ্যমের চকচকে জীবনের ভেতর নিজের ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা হয়তো হারিয়ে যাই না শারীরিকভাবে, কিন্তু মানসিকভাবে কতবার যে অদৃশ্য হয়ে যাই—তার হিসেব কে রাখে?

জোহাতসুর গল্প আমাদের শেখায়—মানুষের ওপর চাপের মাত্রা যখন সীমা ছাড়ায়, তখন সে পালানোর পথ খোঁজে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন সমাজ গড়ছি, যেখানে মানুষ ভুল করতে পারবে? ব্যর্থ হতে পারবে? আবার ফিরে আসার সুযোগ পাবে?

কারণ শেষ পর্যন্ত, কেউ বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যেতে চায় না। মানুষ চায় দেখা যেতে, বোঝা যেতে, গ্রহণ করা হতে। যদি সেই জায়গাটা না থাকে, তবে অদৃশ্য হওয়ার শহরগুলো আরও বড় হতে থাকবে।

আর আমরা হয়তো ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভাবব—সে কি সত্যিই হারিয়ে গেছে, নাকি আমরা তাকে ধরে রাখতে পারিনি?

প্রতি /এডি /শাআ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

20G