৫,২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহধস, নেপালে আধা ঘণ্টায় ৩০ ফুট বেড়েছে নদীর পানি
তিব্বত সীমান্তঘেঁষা নেপালে বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে হিমবাহধস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন ভূবিজ্ঞানীরা। তাঁদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের বড় অংশ ভেঙে পড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও পলিমাটি নেমে এসে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।
মার্কিন কৃত্রিম উপগ্রহ প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবসের তোলা দুর্যোগের আগের ও পরের ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এমন ধারণা দিয়েছেন। রয়টার্সও ওই স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করেছে।
তবে হিমবাহের এত বড় অংশ কেন ধসে পড়ল, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি গবেষকেরা। নেপালের সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, বন্যার কয়েক মিনিট আগে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্প এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা
নেপাল ও চীন সীমান্তের দুই পাশেই হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নেপালে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। দেশটির সরকারের হিসাবে, ৩০০ জনের বেশি পর্যটক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনের সীমান্তবর্তী অংশে তিনজনের মৃত্যু এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধারকাজ ও নিখোঁজদের সন্ধান অব্যাহত থাকায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা পরে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্যাটেলাইটের ছবিতে দুর্যোগের ভয়াবহতাও স্পষ্ট হয়েছে। রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগে সবুজে ঢাকা পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অংশ এখন বাদামি রঙের ধ্বংসস্তূপ ও পলিমাটিতে ঢেকে গেছে।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্বের অধ্যাপক বিক্রম গুপ্তের মতে, হিমবাহের সামনের অংশের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়াই ঘটনাটির সূচনা করে থাকতে পারে। তাঁর ধারণা, বরফের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলিও নিচের দিকে নেমে আসে।
আগের ২৪ ঘণ্টায় বরফ গলার ইঙ্গিত
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগারও স্যাটেলাইট চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন। তাঁর মতে, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ গলার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, আগের দিন পর্যন্ত উপত্যকার কয়েকটি হিমবাহ বরফে ঢাকা ছিল। কিন্তু পরদিনের ছবিতে সেখানে উন্মুক্ত বরফস্তর দেখা যায়। তাঁর মতে, এ পরিবর্তন ওই এলাকায় তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়ার সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করতে পারে।
ড্যান শুগারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে যায়। পরে সেই অংশ প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় গিয়ে পড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন
নেপালের হিমবাহগুলোর দ্রুত গলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। জাতিসংঘ ২০২৩ সালে জানিয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে নেপালের বরফঢাকা পাহাড়গুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে।
জাতিসংঘের ওই মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছিল, ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় পরবর্তী দশকে প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি দ্রুতগতিতে গলেছে।
তবে এবারের দুর্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ঠিক কতটা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের প্রভাবও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বরফ-পাথরের ধসেই কি আকস্মিক বন্যা?
নেপালের রসুয়া জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। বুধবারের ঘটনায় এই পাহাড়ি জেলাটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকায় বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের একটি ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এর প্রভাবে লেন্দে নদীতে বরফ ও পলিমাটিমিশ্রিত আকস্মিক বন্যা তৈরি হয়।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের ফলে তুষারধস এবং পরে সেখান থেকে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। তবে নেপালের ওই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল জানিয়েছেন, ভূমিকম্পই পুরো ঘটনার প্রধান কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণের পর তাঁর ধারণা, নেপালের অংশে বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধস থেকেই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়েছে।
মাত্র ৩০ মিনিটে পানি বাড়ে ৩০ ফুট
হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট জানিয়েছে, পানি, ভূমি ও বায়ুমণ্ডলের দ্রুত পরিবর্তন এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বুধবারের আকস্মিক বন্যায় কোশি ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় প্রচণ্ড স্রোতে পানি, পলি ও বড় বড় পাথর ভেসে যায়। ভাটির দিকে গালছি এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সেখানে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট বেড়ে যায়।
উজানে আটকে আছে পানি, নতুন বন্যার আশঙ্কা
দুর্যোগের পর নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে আছে। ফলে সেখানে জমে থাকা পানি বা ধ্বংসস্তূপের কোনো অংশ সরে গেলে আবারও আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বুধবার পার্লামেন্টে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে ভূমিকম্প ও বন্যার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
আবারও বন্যার সতর্কতা
নেপালে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকালে বন্যা ও ভূমিধস নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাংও নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
এএফপিকে তিনি বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো পানি ও ধ্বংসাবশেষের কারণে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সেটি ভেঙে গেলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের বন্যা নেমে আসতে পারে।
২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এবারের বন্যা ও ভূমিধসকে নেপালের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতি / এডি / শাআ























