কবিগুরুর কয়েকটি ছোটগল্প রচনার পেছনের কাহিনী।

প্রকাশঃ জানুয়ারি ১৫, ২০১৫ সময়ঃ ৪:১০ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৪:১৯ অপরাহ্ণ

রবনিদ্ররবি ঠাকুরের ভক্ত সংখ্যা আমাদের দেশে অনেক। কেউ কেউ তো তাকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করেন। তাঁর লেখা আমি ভীষণ পছন্দ করি। তাঁর সকল সৃষ্টির মতো ছোটগল্পগুলোও এককথায় অসাধারণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার। আসলে বাংলা ভাষায় ছোটগল্প তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর দেখানো পথেই পরবর্তী লেখকগণ হেঁটেছেন বা চেস্টা করেছেন। যাইহোক, রবি ঠাকুরের ছোটগল্পের সাহিত্য-সমালোচনা আমার উদ্দেশ্য নয়; আর এটা আমার বাপ-দাদা চৌদ্দগুষ্টির পক্ষেও সম্ভব নয়। আসলে আমার লেখার মূল প্রতিপাদ্য হলো তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত ছোটগল্প রচনার পেছনের কাহিনী বা কোন প্রেক্ষিতে এটি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পে পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলি বা আধুনিক ধ্যানধারণা সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করতেন। কখনও তিনি মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বৌদ্ধিক বিশ্লেষণকেই গল্পে বেশি প্রাধান্য দিতেন। চলুন বেহুদা প্যাচাল না পেরে সোজা মূল বিষয়ে চলে যাই।

পোস্টমাস্টারঃ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার এক ধনাঢ্য জমিদার পরিবারের অন্যতম সদস্য ছিলেন এই গল্প সবার জানা। কবি হলেও জমিদারী দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে রেহাই পাননি তিনি। আপনারা অনেকেই জানেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে তাঁর একটি কাচারি বাড়ি ছিল। এই বাড়িতে বসেই তিনি জমিদারী দেখাশোনা করতেন। যাইহোক, রবি ঠাকুরের অতি জনপ্রিয় একটি ছোটগল্প ‘পোস্টমাস্টার’। এই কাচারি বাড়ির একতলাতে একটা পোস্ট অফিস ছিল। সেখানকার পোস্টমাস্টার মহাশয়ের সাথে তাঁর প্রায় প্রতিদিন দেখা হত এবং তাদের মধ্যে অনেক কথা-বার্তা, গল্প-গুজব হত। কবিগুরু প্রায় প্রতিদিন দিনের বা রাতের কোন একটা সময় পোস্টমাস্টার সাহেবের সাথে কাটাতেন। মূলত এই পোস্টমাস্টার মহাশয়ের জীবনের নানা কাহিনী অবলম্বনেই তিনি এই গল্পটি লেখেন। “একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল, ‘ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সংগে করিয়া লইয়া আসি’-…ফিরিয়া ফল কি’ এই লেখাটুকু এতই মর্মস্পর্শী যে চোখে পানি এসে যায়।
রবিন্দ্র

 

 

 

 

 

 

জরুরী তথ্যঃ সরকার এই কাচারি বাড়ি কে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটা এখন প্রত্নতত্ত অধিদপ্তরের অধীন।

 

কংকালঃ
ছোটবেলায় কবি যে ঘরে শুতেন সেখানে একটা মেয়ে মানুষের skeleton ঝুলানো ছিল। সে সময় তাঁর তেমন একটা ভয়-টয় করত না। পরিণত বয়সে একদিন বাড়িতে অতিথি সমাগম হওয়াতে তাকে বাইরে শোবার দরকার পরেছিল। অনেকদিন পরে সেই ঘরে তিনি আবার শুয়েছেন। শুয়ে তাঁর মনে হতে লাগল, সেজের আলোটা ক্রমে কাঁপতে কাঁপতে নিভে গেলো। তাঁর আরও মনে হতে লাগল, কে যেন মশারির চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর বলছে ‘আমার কংকালটা কোথায় গেল’, ‘আমার কংকালটা কোথায় গেল’? ক্রমে মনে হতে লাগল সে দেয়াল হাতড়ে বন বন করে ঘুরতে আরম্ভ করেছে। এভাবেই তাঁর মাথায় এসে গেল এই ‘কংকাল’ গল্পটা।

জীবিত ও মৃতঃ
কবিগুরুর ভোররাতে উঠে অন্ধকার ছাদে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস ছিল। তেমনি একদিন রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে যেতেই তিনি উঠে পড়লেন, ভেবেছিলেন উঠার সময় হয়েছে, আসলে তখন গভীর রাত। অভ্যাশবসতঃ তিনি হাঁটতে লাগলেন। সব ঘরের দরজা বন্ধ। সব একেবারে নিরব, নিঝুম। খানিক পড়েই ঢং ঢং করে দু’টো বাজার ঘন্টা পড়ল। তিনি থমকে দাঁড়ালেন, ভাবলেন-তাই তো, এই গভীররাত্রে আমি সারা বাড়িময় এমন করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হঠাত তাঁর মনে হল তিনি যেন প্রেতাত্বা, এ বাড়ি haunt করে বেড়াচ্ছেন। তিনি যেন মোটেই তিনি নন, তাঁর রুপ ধরে বেড়াচ্ছেন মাত্র। এই idea টাই তাকে পেয়ে বসল, যেন একজন জীবিত মানুষ সত্যসত্যই নিজেকে মৃত ব’লে মনে করছে। এভাবেই জীবিত ও মৃত গল্পের সৃষ্টি।

ছুটিঃ
এটাও শাহজাদপুরে কাচারিবাড়ি বসে লেখা তাঁর আর একটি অনবদ্য ছোটগল্প। তখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম বাহন ছিল নৌকা। তিনিও নৌকাযোগেই তাঁর কাচারি বাড়িতে তাঁর জমিদারী দেখাশুনা করতে আসতেন। এমনি একদিন ওই রকম নৌকা ঘাটে ভিড়িয়েছেন। নদীর তীরে গ্রামের অনেক ছেলে খেলা করতে এসেছে। তার মধ্যে সর্দার গোছের একটি ছেলে ছিল। অনেক ডানপিটে স্বভাবের ছিল সে। তার কাজই হলো, এ-নৌকা ও-নৌকা করে বেড়ানো, মাঝিদের কাজ দেখা, মাস্তলের পাল গোটানো দেখা ইত্যাদি। তীরে অনেকগুলো গুড়িকাঠ গাদা-করা অবস্থায় ছিল। মাঝে ছেলেটি তড়াক করে নৌকা থেকে এই কাঠগুলি গড়িয়ে গড়িয়ে নদীতে ফেলতে আরম্ভ করলে। কিন্তু তার আমোদের পথে একটা বিঘ্ন এসে উপস্থিত হল। একটি ছোট মেয়ে এসে গুড়ি চেপে বসল। ছেলেটি তাকে উঠাবার চেস্টা করলে, কিন্তু মেয়েটি তা গ্রাহ্যও করলে না। তখন ছেলেটি তাকে সুদ্দই গুড়িটি উলটে দিলে। মেয়েটি পড়ে গিয়ে বিকট কান্না জুড়ে দিলে, এবং কাঁদতে কাঁদতে উঠেই ছেলেটিকে কষে এক চড় লাগালো। এই ঘটনা থেকেই ‘ছুটি’-র শুরু। সৃষ্টি হলো অন্যতম সেরা একটি গল্পের। এই গল্পে ফটিকের ‘ছুটি’ হয়েছিলচিরতরে।

তথ্য নূত্রঃওয়েবসাইট

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G