অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও বড় বাজেট ঘোষণা
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট এবং রাজস্ব আদায়ে ধীরগতির মধ্যে দেশের অর্থনীতি যখন চাপের মুখে, তখন নতুন অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি বড় বাজেট আসছে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী নতুন বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।
বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে বড় অংশ আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মোট ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা পূরণে সরকারকে ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঘাটতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বাজেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া অনুদান হিসেবে ধরা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফেরানোই বাজেটের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে সাবেক অর্থ সচিবরা মনে করছেন, বাজেটের আকার বড় হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মতে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে বাজেটে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকিরও প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। খাদ্য, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য খাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য থাকবে, যা সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ দখল করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং ব্যবসা সহজীকরণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে জিডিপির প্রায় ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বড় অংশ এবং সরকারি খাতে বাকি অংশ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য থাকলেও জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের কারণে চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন বাজেটে একটি নতুন ধারণা হিসেবে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে সামনে আনা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি নির্ভর খাতে প্রণোদনার মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশাল বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতির মধ্যেই অর্থনীতির বর্তমান চাপ, ঋণনির্ভরতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
প্রতি / এডি / শাআ













