বিশ্বের বড় বড় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে চীন

প্রকাশঃ মে ৩০, ২০২৬ সময়ঃ ১১:২৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:২৬ অপরাহ্ণ

বিশ্বের শীর্ষ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নতুন এক প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের বহু পরিচিত ব্র্যান্ড ধীরে ধীরে বাজার হারাচ্ছে চীনা কোম্পানিগুলোর কাছে। শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি নয়, ব্যাটারি প্রযুক্তি, সফটওয়্যার, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ও স্মার্ট ফিচারেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘অটো চায়না ২০২৬’ ঘিরে বেইজিং ও হেফেইয়ের কয়েকটি আধুনিক কারখানা পরিদর্শনে দেখা গেছে, চীনের গাড়ি শিল্পে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সফটওয়্যারনির্ভর উন্নয়ন অনেক পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।

জাপানি গাড়ি নির্মাতা Honda–এর প্রধান নির্বাহী তোশিহিরো মিবে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, চীনের অত্যাধুনিক কারখানাগুলোর সক্ষমতা দেখে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন মনে হচ্ছে।

অন্যদিকে Ford Motor Company–এর প্রধান নির্বাহী জিম ফার্লেও সতর্ক করেছেন, চীনা গাড়ি কোম্পানিগুলোর বৈশ্বিক সম্প্রসারণ পশ্চিমা নির্মাতাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো প্রযুক্তি সরবরাহ করলেও এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। বর্তমানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানিকেই চীনা প্রযুক্তি ও সফটওয়্যারের সহায়তা নিতে হচ্ছে।

সাংহাইভিত্তিক গাড়ি বিশ্লেষক বিল রুসো মনে করেন, বিষয়টি শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতিযোগিতা নয়; ভবিষ্যতের স্মার্ট পরিবহন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও লড়াই চলছে।

‘চাকার ওপর স্মার্ট ডিভাইস’

চীনের গাড়ি শিল্প এখন প্রযুক্তিখাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Xiaomi, Huawei ও Alibaba Group ইতোমধ্যে গাড়ি শিল্পে বড় বিনিয়োগ করেছে।

গাড়িকে এখন কেবল পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সফটওয়্যারনির্ভর স্মার্ট ডিভাইস হিসেবেও দেখা হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় চালনা, ভয়েস কন্ট্রোল, স্মার্ট বিনোদন ব্যবস্থা ও মোবাইল অ্যাপ সংযুক্তির মতো সুবিধাগুলো চীনা ব্র্যান্ডগুলোকে এগিয়ে দিচ্ছে।

বেইজিংয়ের বাইরে শাওমির বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানায় অল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক গাড়ি উৎপাদন হচ্ছে। বাজারে প্রবেশের স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

এদিকে BYD এমন দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা কয়েক মিনিটেই দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণের উপযোগী চার্জ দিতে সক্ষম।

চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা XPeng–এর প্রধান নির্বাহী হে শিয়াওপেং জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে গাড়ি কোম্পানিগুলোকে রোবোটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর বাজার সংকুচিত

বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, চীনের গাড়ির বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর অংশীদারত্ব গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে General Motors, BMW এবং অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানির আয়েও।

বিলাসবহুল গাড়ির বাজারেও এখন চীনা ব্র্যান্ডের প্রভাব বাড়ছে। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন মডেলগুলো উচ্চমূল্যের গাড়ির বাজারেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি এখন চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে। Volkswagen ইতোমধ্যে এক্সপেংয়ের সফটওয়্যার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে। একইভাবে Stellantis চীনা অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

তবে সব প্রচেষ্টা সফল হচ্ছে না। কিছু বিদেশি ব্র্যান্ড চীনের বাজারে প্রত্যাশিত বিক্রি না পাওয়ায় মূল্যছাড় ও পুনর্বিন্যাসের পথে হাঁটছে।

বিশ্ববাজারে আরও আগ্রাসী চীন

দেশীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লেও চীনা গাড়ি কোম্পানিগুলো এখন ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে দ্রুত বিস্তার ঘটাচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাড়তি শুল্ক আরোপের পরও BYD, Chery ও SAIC Motor আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অবস্থান তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গাড়ি উৎপাদন ও সফটওয়্যার প্রযুক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে চীনের দিকে সরে গেলে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক উৎপাদনকেন্দ্র ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব গাড়ি শিল্পে এখন বড় পরিবর্তনের সময় চলছে। যারা দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতের বাজারে টিকে থাকবে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য



আর্কাইভ

20G