হিন্দু, ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মে পশু বলি ও উৎসর্গের ইতিহাস সম্পর্কে যা জানা যায়

প্রকাশঃ মে ২১, ২০২৬ সময়ঃ ১১:৪৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:৪৭ অপরাহ্ণ

বিশ্বের নানা ধর্ম ও লোককাহিনীতে মানবজাতির সূচনালগ্নের গল্পে আদম-হাওয়া বা অ্যাডাম-ইভের নাম উঠে আসে। সেই সূত্র ধরেই ধর্মীয় আচার হিসেবে পশু উৎসর্গ বা বলির ধারণারও প্রাচীন ইতিহাস পাওয়া যায়। ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্মের প্রাচীন বর্ণনায় আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, হাবিল ছিলেন পশুপালক আর কাবিল কৃষিকাজ করতেন। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে দুজনই উৎসর্গ পেশ করেছিলেন। হাবিল তার পশুপালের সেরা অংশ উৎসর্গ করেন, আর কাবিল শস্য নিবেদন করেন। বর্ণনায় বলা হয়, হাবিলের উৎসর্গ গ্রহণ করা হলেও কাবিলেরটি গৃহীত হয়নি। পরে ঈর্ষা ও ক্ষোভ থেকে কাবিল তার ভাইকে হত্যা করেন।

যদিও ইসলামে কোরবানির প্রচলিত রীতি মূলত হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, তবুও অন্যান্য ধর্মেও পশু উৎসর্গের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টান্ত রয়েছে।

সনাতন ধর্মে পশু বলির প্রচলন

হিন্দু ধর্মে পশু বলি নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও বহু অঞ্চলে এখনো এর চর্চা দেখা যায়। বিশেষ করে দেবীকেন্দ্রিক ‘শাক্ত’ উপাসনায় পশু বলির ঐতিহাসিক উপস্থিতি রয়েছে।

সংস্কৃত ও পুরাণভিত্তিক নানা গ্রন্থে পশু উৎসর্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈদিক যুগ থেকেই যজ্ঞ ও বলির ধারণা প্রচলিত ছিল বলে গবেষকেরা মনে করেন। বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে ছাগল বা মহিষ বলির উদাহরণও রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু প্রাচীন মন্দিরে এখনো বিশেষ পূজায় পশু বলি দেওয়া হয়। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, মনসাপূজাসহ নানা আচার অনুষ্ঠানে এ ধরনের রীতি দেখা যায়। তবে আধুনিক সময়ে অনেকেই পশু বলির পরিবর্তে প্রতীকী বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকছেন।

হিন্দু পুরাণে বহুল আলোচিত অশ্বমেধ যজ্ঞেও পশু উৎসর্গের বিষয়টি উঠে আসে। রাজশক্তি ও সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতীক হিসেবে এই যজ্ঞ পরিচালিত হতো বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

ইহুদি ধর্মে উৎসর্গের ঐতিহ্য

ইহুদি ধর্মে পশু উৎসর্গ দীর্ঘদিন ধর্মীয় আচার ও উৎসবের অংশ ছিল। বিশেষ করে পাসওভার, শাভুওয়াত ও সুখট উৎসবের সঙ্গে পশু উৎসর্গের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য।

ইহুদি ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, মিশরে দাসত্বের সময় নবী মূসা (আ.)-এর নেতৃত্বে ইসরায়েলিদের মুক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাসওভার উৎসবের সূচনা হয়। তখন ভেড়া উৎসর্গ করে তার রক্ত দরজায় চিহ্ন হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে ধর্মীয় বর্ণনায় পাওয়া যায়।

প্রাচীন ইহুদি সমাজে নির্দিষ্ট মন্দিরে পশু উৎসর্গের বিধান ছিল। তবে জেরুজালেমের সেই মন্দির ধ্বংস হওয়ার পর অধিকাংশ ইহুদির মধ্যে এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে অনেক ইহুদি প্রার্থনা বা দানের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে স্মরণ করেন।

ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী উৎসর্গের জন্য পশুকে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হতো, যাকে ‘কোশার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

খ্রিষ্টধর্মে বলিদানের ধারণা

খ্রিষ্টধর্মের পুরাতন নিয়ম বা ওল্ড টেস্টামেন্টে পশু উৎসর্গের উল্লেখ রয়েছে, যা ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করে। অতীতে পাপমোচন ও অনুতাপের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন উৎসবে পশু বলি দেওয়া হতো।

তবে খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশুখ্রিষ্টের আত্মত্যাগই মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ উৎসর্গ। এজন্য পরবর্তীকালে পশু বলির ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তা আর থাকেনি।

খ্রিষ্টধর্মে যিশুকে ‘ল্যাম্ব অফ গড’ বা ঈশ্বরের মেষশাবক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পশু বলির প্রচলন না থাকলেও কিছু সংস্কৃতিতে উৎসব উপলক্ষে মেষের মাংস খাওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে দৃষ্টিভঙ্গি

তিন ধর্মেই পশু উৎসর্গের ঐতিহাসিক উপস্থিতি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যাখ্যা ও চর্চায় পরিবর্তন এসেছে। কোথাও এটি প্রতীকী আকার নিয়েছে, কোথাও সীমিত হয়েছে, আবার কোথাও এখনো ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে টিকে আছে। ধর্মীয় গবেষকদের মতে, আধুনিক যুগে অনেক ক্ষেত্রেই আচারগত বলির চেয়ে আত্মত্যাগ, দান ও আধ্যাত্মিকতার দিকটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G