শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, প্রাণহানি লাখ ছাড়াতে পারে!
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনার পর বাংলাদেশেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু কম্পন অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়, তবু বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের কম্পনের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানী ঢাকায় যদি ৬ থেকে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে ব্যাপক প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাদের ধারণা, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে পড়ার কারণে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।
প্রকৌশলীদের একটি বহুল পরিচিত বক্তব্য হলো, “ভূমিকম্প নয়, দুর্বল ভবনই মানুষকে হত্যা করে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণবিধি অমান্য করে ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির ঘাটতির কারণে দেশের নগরাঞ্চলগুলো বিশেষ করে ঢাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে কয়েক ডজন ভূমিকম্প ঘটে এবং প্রতি বছর ৭ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ১৫ থেকে ১৬টি শক্তিশালী ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও ব্যাখ্যা করেন, ভূমিকম্পের মাত্রা (Magnitude) এবং তীব্রতা (Intensity) এক বিষয় নয়। মাত্রা দিয়ে ভূমিকম্পে নির্গত শক্তি বোঝানো হয়, আর তীব্রতা নির্দেশ করে নির্দিষ্ট এলাকায় এর প্রভাব কতটা ছিল। শক্তিশালী কম্পনের সঙ্গে যদি তীব্রতাও বেশি হয়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। অতীতে ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প এবং ১৮৯৭ সালের ডাউকি ফল্টের শক্তিশালী ভূমিকম্প এই অঞ্চলের বড় দুর্যোগের উদাহরণ। গবেষকদের মতে, বড় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির একটি দীর্ঘ চক্র থাকলেও কখন ঠিক এমন ঘটনা ঘটবে, তা আগাম নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প বাংলাদেশে ভবিষ্যতে ঘটতেই পারে। অতীতে কাছাড়, বেঙ্গল, শ্রীমঙ্গল ও ধুবড়ি অঞ্চলে ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ভবিষ্যতের ঝুঁকিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের চারপাশে ডাউকি ফল্ট, আরাকান ফল্ট এবং কয়েকটি সক্রিয় প্লেট বাউন্ডারি রয়েছে, যেগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তৈরি করে। এর মধ্যে ডাউকি ফল্টকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তাদের মতে, বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। পূর্বের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। যদিও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রস্তুত হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ২১ লাখ বসবাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বহুতল ভবনের একটি বড় অংশ কাঠামোগত ঝুঁকিতে থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। তাই এখনই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত, প্রয়োজনীয় সংস্কার, কঠোরভাবে নির্মাণবিধি বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রতি / এডি / শাআ













