দই বানাতে ‍যদি দই লাগে, তাহলে পৃথিবীর প্রথম দই তৈরি হয়েছিল কীভাবে?

প্রকাশঃ জুলাই ৩১, ২০২৬ সময়ঃ ১০:০৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:০৬ অপরাহ্ণ

দুধে সামান্য পুরোনো দই মিশিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিলেই তৈরি হয় সুস্বাদু দই। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, যখন পৃথিবীতে কোনো দইই ছিল না, তখন প্রথম দইটি তৈরি হলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, মানুষের পর্যবেক্ষণ এবং হাজার বছরের ইতিহাসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দই আবিষ্কার কোনো পরিকল্পিত গবেষণার ফল নয়, বরং এটি ছিল এক প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা। বহু হাজার বছর আগে মানুষ দুধ সংরক্ষণের জন্য পশুর চামড়ার তৈরি থলি ব্যবহার করত। সেই চামড়ায় থাকা প্রাকৃতিক উপকারী ব্যাকটেরিয়া দুধের সঙ্গে মিশে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটাত। এর ফলে দুধ ধীরে ধীরে জমে টক ও ঘন এক ধরনের খাবারে পরিণত হতো, যা আজ আমরা দই নামে চিনি।

অভিজ্ঞতা থেকেই শেখে মানুষ

সেই সময় মানুষ ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীব সম্পর্কে কিছুই জানত না। তারা শুধু লক্ষ্য করেছিল, নির্দিষ্ট পরিবেশে রাখা দুধ জমে সুস্বাদু খাবারে পরিণত হয়। পরে তারা আরও একটি বিষয় বুঝতে পারে, আগে তৈরি হওয়া দইয়ের সামান্য অংশ নতুন দুধে মিশিয়ে দিলে দই আরও দ্রুত জমে। এভাবেই ধীরে ধীরে দই থেকে দই তৈরির প্রচলিত পদ্ধতির জন্ম হয়।

দইয়ের ইতিহাস কত পুরোনো?

গবেষকদের ধারণা, দুধ থেকে দই তৈরির ইতিহাস লিখিত সভ্যতারও বহু আগের। মানুষের কৃষিভিত্তিক জীবন শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে দুধ জমিয়ে খাবার তৈরির প্রচলন ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিশ্বের নানা অঞ্চলে জনপ্রিয় খাদ্যে পরিণত হয়।

‘ইয়োগার্ট’ শব্দের উৎপত্তি

বর্তমানে ইংরেজিতে দইকে Yogurt বলা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, শব্দটির উৎস তুর্কি ভাষা। তুর্কি শব্দ ‘ইয়োগ’ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ কোনো তরলকে ঘন বা জমাট করা। পরে এই শব্দ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

ইতিহাসে দইয়ের উল্লেখ

রোমান যুগের লেখাতেও দুধ জমিয়ে তৈরি টক খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার ভারতের প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও দুধজাত জমাট খাবারের উপকারিতা বর্ণনা করা হয়েছে। ইতিহাসে আরও জানা যায়, মঙ্গোল শাসক চেঙ্গিস খানের সৈন্যদের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত দই থাকত। পরে ইউরোপেও দই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত খাবারে পরিণত হয়।

দই জমার বৈজ্ঞানিক কারণ

বিশ শতকের শুরুতে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, দই তৈরির মূল ভূমিকা পালন করে ল্যাকটোব্যাসিলাস ও স্ট্রেপ্টোকোকাস ধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া। এই অণুজীব দুধের ল্যাকটোজ ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে। এর ফলে দুধ জমে যায় এবং দইয়ের পরিচিত টক স্বাদ ও ঘনত্ব তৈরি হয়।

ঘরে তৈরি দই কেন আলাদা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরে তৈরি দইয়ে সাধারণত প্রয়োজনীয় সময় ধরে প্রাকৃতিকভাবে গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে, অনেক বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত দইয়ে স্বাদ, ঘনত্ব ও সংরক্ষণক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন স্টেবিলাইজার, মিষ্টিজাতীয় উপাদান বা অন্যান্য সংযোজন ব্যবহার করা হতে পারে। তাই খাঁটি স্বাদ ও প্রাকৃতিক গুণাগুণের জন্য অনেকেই ঘরে তৈরি দইকে বেশি গুরুত্ব দেন।

দইয়ের ইতিহাস প্রমাণ করে, মানুষের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের মতো এটিও এসেছে প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে। হাজার বছর আগে একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবর্তন থেকেই জন্ম নিয়েছিল আজকের জনপ্রিয় এই খাবার, যা এখনও বিশ্বের কোটি মানুষের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

July 2026
SSMTWTF
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
20G