পৃথিবীর পাশেই এক রহস্যময় জগৎ, যেখানে আবহাওয়া বদলায় পৃথিবীর মতোই
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যেমন মেঘের ঘনত্ব ও চেহারা সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, তেমনি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে সৌরজগতের বাইরের এক অদ্ভুত মহাজাগতিক বস্তুতেও। পৃথিবী থেকে প্রায় সাড়ে ৭ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই বস্তুটির বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করে এমন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে মেঘের পরিবর্তন এবং বায়ুমণ্ডলের গভীর থেকে বিভিন্ন গ্যাস উপরের দিকে উঠে আসার সম্ভাব্য চিত্র।
মহাজাগতিক বস্তুটির নাম ডব্লিউআইএসই ০৮৫৫ (WISE 0855)। এটি প্রচলিত অর্থে কোনো গ্রহ নয়, আবার সাধারণ নক্ষত্রও নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এ ধরনের বস্তুকে বলা হয় বাদামি বামন বা ব্রাউন ডোয়ার্ফ। আকারে বৃহস্পতির কাছাকাছি হলেও এর বৈশিষ্ট্য ও বায়ুমণ্ডল বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
গ্রহ ও নক্ষত্রের মাঝামাঝি এক জগৎ
বাদামি বামনকে অনেক সময় গ্রহ ও নক্ষত্রের মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্যের মহাজাগতিক বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ভর সাধারণ নক্ষত্রের মতো কেন্দ্রে স্থায়ীভাবে হাইড্রোজেন সংযোজন বিক্রিয়া চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তবে সৃষ্টির সময় অর্জিত তাপের কিছু অংশ এটি ধরে রাখতে পারে।
ডব্লিউআইএসই ০৮৫৫-এর অন্যতম বিশেষত্ব হলো এর অত্যন্ত শীতল বায়ুমণ্ডল। তাপমাত্রা কম থাকায় সেখানে জলীয় মেঘ তৈরি হওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি থাকতে পারে। ফলে বস্তুটির বায়ুমণ্ডলে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা জানার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহের আবহাওয়া সম্পর্কেও ধারণা পাওয়ার আশা করছেন।
জেমস ওয়েবের চোখে ধরা পড়ল মেঘের পরিবর্তন
ডব্লিউআইএসই ০৮৫৫-এর বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করা হয়েছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। বিজ্ঞানীরা প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর বস্তুটি থেকে আসা আলোর বর্ণালিগত তথ্য সংগ্রহ করেন। পরবর্তী সময়ে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এর বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, সময়ের ব্যবধানে বস্তুটির মেঘের ঘনত্বে পরিবর্তন ঘটছে। কোথাও মেঘের স্তর ঘন হচ্ছে, আবার কোথাও তা তুলনামূলক পাতলা হয়ে আসছে। এত দূরের একটি মহাজাগতিক বস্তুর বায়ুমণ্ডলে এ ধরনের পরিবর্তন শনাক্ত করা জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
বায়ুমণ্ডলের গভীর থেকে উঠে আসছে গ্যাস
মেঘের পরিবর্তনের পাশাপাশি ডব্লিউআইএসই ০৮৫৫-এর বায়ুমণ্ডলে কার্বন মনোক্সাইড ও ফসফিনের মতো গ্যাসের চলাচলেরও ইঙ্গিত পেয়েছেন গবেষকেরা। তাঁদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলের গভীর অংশ থেকে এসব গ্যাস উপরের দিকে উঠে আসতে পারে।
বস্তুটির অভ্যন্তরীণ তাপ এবং বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে গ্যাসের চলাচল এ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃহস্পতির মতো বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহেও বায়ুমণ্ডলের গভীর স্তর ও ওপরের স্তরের মধ্যে পদার্থের আদান-প্রদানের ঘটনা দেখা যায়। তাই ডব্লিউআইএসই ০৮৫৫-এর পর্যবেক্ষণ গ্রহীয় বায়ুমণ্ডলের গতিপ্রকৃতি বুঝতে সহায়ক হতে পারে।
সৌরজগতের বাইরের আবহাওয়া বুঝতে নতুন সম্ভাবনা
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল-এ। গবেষণার ফলাফল সৌরজগতের বাইরের শীতল মহাজাগতিক বস্তুগুলোর বায়ুমণ্ডল নিয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে।
বিজ্ঞানীদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এ ধরনের বস্তুর মেঘ কীভাবে তৈরি হয়, কত দ্রুত তাদের গঠন বদলায় এবং অভ্যন্তরীণ তাপ বায়ুমণ্ডলের ওপর কী প্রভাব ফেলে। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে সৌরজগতের বাইরের বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহগুলোর আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
প্রতি / এডি / শাআ























