পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থান কোথায়? মানুষ সেখানে কীভাবে জীবনযাপন করে!

প্রকাশঃ জুন ১৩, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৫৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৫৫ অপরাহ্ণ

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করলেও কোটি কোটি মানুষ পাহাড়ি অঞ্চলের উচ্চভূমিতে জীবন কাটান। তবে পৃথিবীর কিছু জনপদ এতটাই উঁচুতে অবস্থিত যে সেখানে বসবাস করা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। অক্সিজেনের স্বল্পতা, তীব্র ঠান্ডা এবং কঠিন পরিবেশ সত্ত্বেও এসব এলাকায় মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে।

সবচেয়ে উঁচু জনবসতিগুলো কোথায়?

বিশ্বের উচ্চতম স্থায়ী জনবসতিগুলোর মধ্যে রয়েছে চীনের চিংহাই অঞ্চলের ওয়েনকুয়ান এবং ভারতের লাদাখের করজোক গ্রাম। তবে স্থায়ী জনসংখ্যা ও উচ্চতার দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত শহর হলো পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার লা রিনকোনাদা।

এই খনি-নির্ভর শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। কয়েক দশক ধরে সোনার খনিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শহরটিতে বর্তমানে হাজার হাজার মানুষের বসবাস।

কঠিন বাস্তবতায় টিকে থাকা

লা রিনকোনাদার জীবনযাত্রা আধুনিক শহরের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে মৌলিক নাগরিক সুবিধার ঘাটতি ছিল। খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বড় অংশ পাহাড়ের নিচের অঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হয়।

প্রচণ্ড ঠান্ডা, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অক্সিজেনের স্বল্পতার মধ্যেও স্থানীয় বাসিন্দারা মূলত খনি কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সোনার সন্ধানই বহু মানুষকে এই কঠিন পরিবেশে বসবাস করতে উৎসাহিত করেছে।

উচ্চতায় গেলে শরীরে কী ঘটে?

সমতল এলাকার কোনো ব্যক্তি হঠাৎ করে অনেক উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে গেলে শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকায় শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায় এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি নিঃশ্বাসে শরীরে প্রবেশ করা অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছে দিতে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়।

এ অবস্থায় অনেকের মাথাব্যথা, ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বা ‘অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস’ বলা হয়।

দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে মানিয়ে নেয় শরীর?

যাঁরা জন্ম থেকেই উচ্চভূমিতে বসবাস করেন, তাঁদের শরীরে ধীরে ধীরে কিছু বিশেষ পরিবর্তন ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মানুষের ফুসফুস তুলনামূলক বড় হয় এবং কম অক্সিজেনেও শরীরকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।

আন্দিজ অঞ্চলের বাসিন্দাদের রক্তে সাধারণ মানুষের তুলনায় হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বেশি থাকে। এর ফলে রক্ত কম অক্সিজেন থেকেও বেশি পরিমাণ অক্সিজেন সংগ্রহ করে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দিতে পারে।

তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অতিরিক্ত হিমোগ্লোবিনের কারণে রক্ত ঘন হয়ে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এ কারণে অনেক বাসিন্দা ‘ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস’ নামে পরিচিত রোগে আক্রান্ত হন।

তিব্বতিদের অভিযোজন কেন আলাদা?

তিব্বতের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী মানুষেরা ভিন্ন একটি জৈবিক অভিযোজন গড়ে তুলেছে। তাঁদের শরীরে হিমোগ্লোবিন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় না। পরিবর্তে রক্ত সঞ্চালনের দক্ষতা বাড়িয়ে শরীর কম অক্সিজেনের পরিবেশে মানিয়ে নেয়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ‘ইপিএএস১’ (EPAS1) নামের একটি বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্য এই অভিযোজনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ফলে তিব্বতিদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চতাজনিত রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা যায়।

মানুষের অভিযোজনের অনন্য উদাহরণ

অক্সিজেনের ঘাটতি, তীব্র ঠান্ডা ও কঠিন জীবনযাত্রা সত্ত্বেও বিশ্বের উচ্চতম জনবসতিগুলো মানবদেহের অভিযোজন ক্ষমতার এক অসাধারণ উদাহরণ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব অঞ্চলের মানুষ এমন পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে, যা সমতলের মানুষের কাছে প্রায় অকল্পনীয়।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

July 2026
SSMTWTF
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
20G