এআইয়ের পরামর্শে পাহাড়ে হাইকিং, আটকে পড়ে হেলিকপ্টারে উদ্ধার কিশোর
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় পাহাড়ে হাইকিংয়ের পথ ঠিক করেছিল ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর। কিন্তু সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বিপজ্জনক পাহাড়ি ঢালে আটকা পড়ে তাকে। পরে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা হেলিকপ্টার ও বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনেন। ঘটনাটি ঘটেছে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের ক্রাউন মাউন্টেনে।
কিশোরটির নাম ব্রাইস ভিনসেন্ট গোওরিলুক। গত ৩ অক্টোবর পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে এই বিপদের মুখে পড়ে সে। হাইকিংয়ের পথ পরিকল্পনা করতে অ্যানথ্রপিকের তৈরি এআই চ্যাটবট ক্লডের সহায়তা নিয়েছিল সে। তবে শুধু এআই নয়, গুগল ম্যাপসসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমও ব্যবহার করেছিল কিশোরটি। পরে সংবাদমাধ্যমকে সে জানায়, ঘটনার জন্য এআইকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। খবরটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
যেভাবে বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছায় কিশোরটি
ব্রাইসের পরিকল্পনা ছিল কানাডার গ্রাউস মাউন্টেন থেকে যাত্রা শুরু করে ক্রাউন মাউন্টেনে যাওয়া এবং পরে ফিরে আসা। এই পথ বেশ দুর্গম। পুরো যাত্রা শেষ করতে সাধারণত সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে উদ্ধারকারী দল নর্থ শোর রেসকিউ।
হাইকিংয়ের পথ নির্ধারণের সময় ক্লড এআইয়ের পরামর্শ নিয়েছিল ব্রাইস। কিন্তু যাত্রাপথে সে ধীরে ধীরে পরিচিত হাইকিং ট্রেইল থেকে সরে যায়। একপর্যায়ে বিপজ্জনক পাথুরে এলাকা পেরিয়ে এমন একটি স্থানে পৌঁছে যায়, যেখান থেকে সামনে এগোনো কিংবা নিরাপদে পেছনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরে সে বুঝতে পারে, পর্বতারোহীদের কাছে ‘উইডোমেকার অ্যারেট’ নামে পরিচিত একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ আরোহণপথের কাছে আটকে পড়েছে। ওই পথের খাড়া পাথুরে দেয়ালে আরোহণের জন্য বিশেষ দক্ষতা ও সরঞ্জাম প্রয়োজন। সাধারণ হাইকিংয়ের প্রস্তুতি নিয়ে সেখানে নিরাপদে চলাচল করা সম্ভব নয়।
একপর্যায়ে পাহাড়ের খাড়া দেয়ালের নিচে পাথরের সরু অংশে আটকে পড়ে ব্রাইস। সেখান থেকে পড়ে গেলে গুরুতর আহত হওয়া, এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কাও ছিল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে সে জরুরি সহায়তা চায়।
হেলিকপ্টার নিয়ে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান
বিপজ্জনক স্থানে কিশোরের আটকে পড়ার খবর পাওয়ার পর উদ্ধার অভিযানে নামে নর্থ শোর রেসকিউ দল। দুর্গম পাহাড়ি অবস্থানের কারণে উদ্ধারকারীদের পক্ষে সরাসরি তার কাছে পৌঁছানো সহজ ছিল না। এ জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে পাহাড়ের খাড়া দেয়ালের খুব কাছে হেলিকপ্টার নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এতে হেলিকপ্টার থেকে উদ্ধারকর্মীদের কিছুটা ওপরের নিরাপদ স্থানে নামানো হয়। এরপর দড়ি ও পর্বতারোহণের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করে তাঁরা নিচে নেমে কিশোরটির কাছে পৌঁছান।
উদ্ধারকারীরা প্রথমে তাকে নিরাপদ অবস্থানে সরিয়ে নেন। পরে হেলিকপ্টারে তোলার উপযোগী জায়গায় নিয়ে গিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। জরুরি খবর পাওয়ার পর পুরো অভিযানে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নর্থ শোর রেসকিউয়ের অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক পল মার্কি জানান, ওই স্থান থেকে পড়ে গেলে কিশোরটির গুরুতর আঘাত পাওয়ার বা প্রাণ হারানোর আশঙ্কা ছিল। উদ্ধার হওয়ার সময় সে ভীষণ ভীত ও আতঙ্কিত ছিল।
বিপদের মুহূর্তে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ
পাহাড়ে আটকে পড়ার পর ব্রাইস জরুরি সহায়তার জন্য পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ সময় মায়ের সঙ্গেও ফোনে কথা বলে সে। ছেলের বিপদের খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তার মা জোয়েল।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জোয়েল জানান, ছেলে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো এবং নিজের সক্ষমতা যাচাই করার উদ্দেশ্যেই হাইকিংয়ে বের হয়েছিল। কিন্তু সেই যাত্রা যে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে, তা তিনি ভাবেননি।
সন্তানকে উদ্ধারের জন্য হেলিকপ্টার পাঠাতে হচ্ছে, এমন খবর কোনো মা-বাবার কাছেই প্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এআইকে এককভাবে দায়ী করছেন না কিশোর
ঘটনার পর এআইয়ের দেওয়া নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও ব্রাইস নিজে পুরো দায় চ্যাটবটের ওপর চাপাতে চাননি। সংবাদমাধ্যমকে সে জানিয়েছে, হাইকিংয়ের পথ নির্ধারণের সময় ক্লডের পাশাপাশি গুগল ম্যাপস ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমও ব্যবহার করেছিল। তার ধারণা ছিল, সে সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
কিন্তু পথ ক্রমেই খাড়া ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার পর সে বুঝতে পারে, স্বাভাবিক হাইকিং ট্রেইল থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। তখন আর নিজে নিরাপদে ফিরে আসার উপায় ছিল না।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, ডিজিটাল মানচিত্র কিংবা এআইয়ের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করলেও দুর্গম এলাকায় পথ ভুল হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো পথ সাধারণ হাঁটার উপযোগী, নাকি বিশেষ আরোহণ দক্ষতা প্রয়োজন, তা বোঝার জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এআইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করার পরামর্শ
উদ্ধারকারী দলের সদস্য পল মার্কি হাইকিংয়ে এআই ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই চ্যাটবট কোনো নির্দিষ্ট পাহাড়ি পথের বাস্তব পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে না। ফলে কোনো রুটের প্রকৃত ঝুঁকি, পাথরের অবস্থা কিংবা নিরাপদে চলাচলের উপযোগিতা সম্পর্কে এর দেওয়া তথ্য সব সময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে।
দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের আগে নির্ভরযোগ্য মানচিত্র, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আবহাওয়া, যাত্রাপথের কঠিন অংশ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও নিজের শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করা উচিত।
উদ্ধারকারীদের সতর্কবার্তার মূল কথা হলো, প্রযুক্তি ভ্রমণের পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার বিকল্প নয়।
এআইয়ের দেওয়া পথ অনুসরণ করে বিপদে পড়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় ডিজিটাল নেভিগেশন ও এআইয়ের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে ভ্রমণকারীদের সমস্যায় পড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে পাহাড়ে হাইকিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।
প্রতি / এডি / শাআ



















