শৈশবে শারীরিকভাবে ফিট শিশুরা বড় হয়ে বিষণ্নতায় কম ভোগে, বলছে গবেষণা
ছোটবেলায় খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ ও শারীরিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার সুফল শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব থাকতে পারে বড় বয়সের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে যেসব শিশুর হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা ভালো থাকে, তাদের প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে।
‘জার্নাল অব অ্যাফেক্টিভ ডিজঅর্ডারস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবের শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে পরবর্তী জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের একটি যোগসূত্র রয়েছে। বিশেষ করে কার্ডিওরেসপিরেটরি ফিটনেস বা হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ভবিষ্যতে বিষণ্নতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে পেশির শক্তির সঙ্গে পরবর্তী জীবনে বিষণ্নতার ঝুঁকির উল্লেখযোগ্য সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পাননি গবেষকেরা।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গ্রান্ট টমকিনসন জানান, যেসব শিশু ও কিশোর-কিশোরীর হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা ভালো থাকে, পরবর্তী জীবনে তাদের বিষণ্নতায় ভোগার ঝুঁকি কম হতে পারে। তাঁর মতে, নিয়মিত শারীরিক অনুশীলনের মাধ্যমে ফিটনেস বাড়ানো সম্ভব। তাই শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।
যেভাবে চালানো হয় গবেষণা
শৈশবের ফিটনেসের সঙ্গে বড় বয়সের মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক বুঝতে গবেষকেরা এক হাজারের বেশি মানুষের তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯৮৫ সালে অংশগ্রহণকারীরা যখন শিশু ছিল, তখন তাদের শারীরিক সক্ষমতা পরিমাপ করা হয়েছিল।
হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা যাচাই করতে শিশুদের এক মাইল দৌড়াতে দেওয়া হয়। পেশির শক্তি পরিমাপের জন্য নেওয়া হয় দাঁড়িয়ে লাফ দেওয়ার পরীক্ষা, যা ‘স্ট্যান্ডিং লং জাম্প’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া কিছু অংশগ্রহণকারীর সাইকেল চালানোর সময় হৃৎস্পন্দন পরিমাপ করা হয় এবং হাতের মুঠির শক্তিও পরীক্ষা করা হয়।
গবেষক গ্রান্ট টমকিনসনের ভাষ্য অনুযায়ী, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং ভালো ফিটনেসের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক আগে থেকেই জানা ছিল। তবে শৈশবে অর্জিত ফিটনেস বহু বছর পর প্রাপ্তবয়স্ক বয়সের মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত হতে পারে, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমার হার
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, শৈশবে ভালো শারীরিক সক্ষমতা থাকা নারীদের ৩৬ থেকে ৪৯ বছর বয়সে বিষণ্নতার ঝুঁকি প্রায় ২০ শতাংশ কম ছিল। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ১১ শতাংশ।
গবেষক ব্রুকলিন ফ্রেজার জানান, যেসব ব্যায়ামে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয় এবং হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসকে বেশি সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হয়, সেগুলো কার্ডিওরেসপিরেটরি ফিটনেস বাড়াতে সাহায্য করে। শৈশবে এই সক্ষমতা ভালো থাকা পরবর্তী জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।
তবে গবেষণার ফলাফলকে এমনভাবে দেখার সুযোগ নেই যে, শুধু শারীরিক ফিটনেসই বিষণ্নতার ঝুঁকি নির্ধারণ করে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জিনগত বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক পরিবেশ, জীবনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক সম্পর্কসহ নানা বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুদের ফিটনেস কেন গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণার প্রধান সদস্য কাইলি স্মিথ মনে করেন, শৈশবের শারীরিক সক্ষমতা কীভাবে পরবর্তী জীবনে বিষণ্নতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিষণ্নতা একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে, তাই একটি বিষয় দিয়ে এর পুরো ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো ভবিষ্যতে বিষণ্নতার ঝুঁকি কমানোর সম্ভাব্য একটি উপায় হতে পারে।
শিশুদের নিয়মিত খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ, সাইকেল চালানো কিংবা বয়স উপযোগী অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা তাই গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভ্যাস তাদের শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে মানসিক সুস্থতার জন্যও সহায়ক হতে পারে।
শৈশবে ফিটনেস কম থাকলেই যে বড় বয়সে বিষণ্নতা দেখা দেবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একইভাবে ভালো ফিটনেস থাকলেই বিষণ্নতা থেকে নিশ্চিত সুরক্ষা পাওয়া যাবে, এমনটিও বলা যায় না। বরং গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, শিশুদের শারীরিক সক্ষমতার যত্ন নেওয়া ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ভালো রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















